আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি গ্রুপের প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বর থেকে কমপক্ষে ৪০০ গজ দূরের দোতলা ভবনের একটি কক্ষে পরিবার নিয়ে থাকেন নাজমা বেগম। গত রোববার সন্ধ্যায় যখন ট্রাকভর্তি সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকে, তখন সে বিস্ফোরণ আঘাত হানে তার ঘরের দেয়ালে। একটি লোহার টুকরা ঢুকে যায় দেয়াল ভেদ করে। এতে দেয়ালে ফাটল ধরেছে ও দুটি বড় বৃত্তাকার ছিদ্র তৈরি হয়েছে।
বিস্ফোরণের সময় ওই কক্ষে ছিলেন গৃহিণী নাজমা ও তার মেয়ে। নাজমা জানান, তিনি ঘরে ছিলেন। মোবাইলে একটি কল আসায় তিনি কথা বলছিলেন। এর ২ মিনিট পরই বিকট শব্দ ও ঝাঁকুনি অনুভব করেন। তিনি বলেন, ‘বিল্ডিংয়ে এমন একটা ঝাঁকি দিল মনে হলো ভূমিকম্প হয়েছে। আমি তো ভয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যাই। এরপর বুঝি কিছু একটা বিস্ফোরণ হয়েছে। রুমে এসে দেখি দেয়াল ভেঙে একটা লোহার টুকরো ভেতরে এসে পড়ে আছে। আর ঘরের জিনিস ও দেয়ালের ইট ভেঙে ছড়িয়ে আছে।’
তার ভাষ্য, ছয় মাসও হয়নি ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যেই এমন দুর্ঘটনায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা।
শুধু নাজমার বাড়িই নয়, আশপাশের আরো কয়েকটি স্থাপনায়ও বিস্ফোরণের ধাক্কা ও ছিটকে যাওয়া বস্তু আঘাত হেনেছে। প্রিটি কম্পোজিট কারখানার অন্য পাশে অবস্থিত মো. আইয়ুব খানের মালিকানাধীন তিনতলা বাড়িতে দুটি গ্যাস সিলিন্ডার গিয়ে পড়ে। এতে তার তিনতলার ছাদের একটি অংশ ও একটি পিলার আংশিক ধসে পড়েছে।
বিস্ফোরণের সময় ছিটকে যাওয়া একটি গ্যাস সিলিন্ডার গিয়ে পড়ে ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরের রানা হোটেলের টিনের চাল ভেদ করে। সিলিন্ডারটির গায়ে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ‘DO NOT USE AFTER 2021’। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর এটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা ছিল। তবে নিয়ম না মেনে এমন হাজারো সিলিন্ডার প্রতিনিয়ত ব্যবহার হচ্ছে।
বিস্ফোরণের পর একটি সিলিন্ডার রানা হোটেলের মালিক মো. হালিমের ছেলের মাথার ওপর পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিকট একটা শব্দ হইল। এরপর দেখি ধোঁয়া। দুই চোখে দেখার মতো কোনো সুযোগ নাই। একটা সিলিন্ডার আমার পোলার মাথার ওপর পড়ে। পোলা দৌড় দিয়া পইড়া যায়। কিছুক্ষণ পর দেহি খালি আগুন আর আগুন। পাশের দোকানে আরেকটা সিলিন্ডার পড়ছে।’
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারবাহী একটি লরিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে সেখান থেকে পাশের লরিগুলোতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত আটজন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন।
ঘটনার পর ২২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানার জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবু তালেব বাদী হয়ে একটি অবহেলাজনিত হত্যার মামলা দায়ের করেন।
মামলায় আসামিরা হলেন জিএম মো. সোহেল রানা, এজিএম মো. মহিউদ্দিন, ম্যানেজার মো. মোজাম্মেল হোসেন, কারখানার প্রকৌশলী মো. রাজীব হোসেন, হেলপার মো. আল আমীন ও মো. এনামুল। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়।
তবে মামলায় প্রিটি গ্রুপের মালিক পক্ষের কারো নাম আসেনি। জানা গেছে, প্রিটি গ্রুপের সিইও রাজীব আহমেদ তালুকদার (পিয়াল) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন। তার মা পারভীন তালুকদার প্রিটি গ্রুপের পরিচালক। তিনি বাকেরগঞ্জ উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের (বরিশাল) সংসদ সদস্য ছিলেন।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে যাদের সরাসরি দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি পাওয়া গেছে, তাদের নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অজ্ঞাত পরিচয় আসামি রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তদন্তে আরো কারো গাফিলতি বা সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
এদিকে বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ীদের বিচার, ক্ষতিপূরণসহ ছয় দফা দাবিতে গত বুধবার মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটি ও টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন এ মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে।
মানববন্ধনে জানানো দাবিগুলো হলো—প্রিটি গ্রুপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা, দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিক এবং তাদের পরিবারকে আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিশ্চিত করা, দেশের সব পোশাক কারখানায় কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
মানববন্ধনে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। বিস্ফোরণের ঠিক আগের দিনও বেআইনিভাবে বেশকিছু শ্রমিককে কারখানা থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর পরদিন এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এটি পরিকল্পিত কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে হবে।’
মানববন্ধনে অংশ নেয়া শ্রমিকদের মধ্যে এখনো কাজে ফিরতে ভয় কাজ করছে। কারখানার আয়রনম্যান আনিছুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার পরদিন সোমবার সকালে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে অনেক শ্রমিককে কারখানায় আসতে বলা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা কাজে যাননি। এরপর থেকে কারখানা বন্ধ আছে।’