ইয়েমেনের হুথিদের একের পর এক হামলায় সৌদি আরবের বিমান চলাচল ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মামের বিমানবন্দরগুলোয় গত দুইদিনে প্রায় দেড় হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আকাশপথেও। ঢাকা থেকে সৌদি আরবের তিন গন্তব্যে সরাসরি ও সংযোগকারী ফ্লাইট মিলিয়ে অন্তত ৫১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে সৌদিতে যেতে পারেননি বাংলাদেশের পাঁচ হাজারের বেশি যাত্রী। কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার শঙ্কা, ছুটি শেষ হয়ে যাওয়া এবং বিকল্প ফ্লাইটের অনিশ্চয়তায় ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রবাসী কর্মীরা।
বিমানবন্দরের স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কার্যক্রম পুনরায় শুরুর প্রস্তুতি যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকবে বলে গতকাল জানিয়েছে দেশটির জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন (জিএসিএ)। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সংস্থাটির সব ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি সময় সোমবার সকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত রিয়াদে ৪৩৬টি, জেদ্দায় ১১৫টি ও দাম্মামে ৬৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। আগের দিন রোববার এ তিন বিমানবন্দরে বাতিল হয় যথাক্রমে ৬৫৫, ১৫৮ ও ৫৮টি ফ্লাইট। দুইদিনে বিমানবন্দরভিত্তিক হিসাবে ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৫। সংযোগকারী ফ্লাইটের কারণে হিসাবে কিছু পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও ফ্লাইট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ, দাম্মাম ও জেদ্দাগামী বিভিন্ন এয়ারলাইনস মোট ৫১টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। এর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ১২টি। বাতিল হওয়া ফ্লাইটের ৫ হাজার ৪১৮ যাত্রী বাংলাদেশে আটকা পড়েছেন। নতুন করে ফ্লাইট বাতিল হলে তা জানানো হবে।’
বাতিল হওয়া সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি এবং রিয়াদ এয়ার ও সৌদিয়ার তিনটি করে ফ্লাইট রয়েছে। পাশাপাশি ৩৯টি সংযোগকারী ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালামএয়ারের তিন, ইজিপ্টএয়ারের এক, এমিরেটসের নয়, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচ ও ফ্লাইদুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব পড়েছে শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করা যাত্রীদের ওপর। সোমবার নির্ধারিত সময়ে সৌদি আরবের উদ্দেশে যাত্রা করতে বিমানবন্দরে এসে অনেকে জানতে পারেন, তাদের ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ এসেছেন দেশের দূরবর্তী জেলা থেকে। অনেকে কর্মস্থলে যোগ দেয়ার তাগিদে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ফেরার টিকিট কেটে রেখেছিলেন। শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা সৌদিতে কর্মস্থলে সময়মতো যোগ দেয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন যাদের নেই তারা পড়েছেন অনির্দিষ্ট সময় ঢাকায় অবস্থানের বিড়ম্বনায়।
নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে গতকাল সকালে বিমানবন্দরে আসেন সোহাগ ইসলাম। সৌদি আরবের দাম্মামগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তার বেলা ২টা ১০ মিনিটে যাত্রার কথা ছিল। ছয় বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করছেন তিনি। রিয়াদে টাইলস মিস্ত্রি হিসেবে কর্মরত সোহাগ তিন মাসের ছুটি কাটিয়ে ফিরছিলেন। ছুটির সময়সীমা অনুযায়ী আগেই টিকিট কেটেছিলেন। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পাওয়ার পর কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে পারবেন কিনা, সে বিষয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানান সোহাগ। চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে তার মধ্যে।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন রিয়াদে একটি দোকানে কর্মরত লিয়াকত হোসেন। দুপুরের ফ্লাইট ধরতে সকাল থেকেই বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। পরে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিকল্প কোনো ফ্লাইটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সোমবার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরে সৌদি আরবগামী আরো অনেক যাত্রীকে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জানতে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
এদিকে চলমান পরিস্থিতির কারণে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে সব ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ফ্লাইট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গতকাল ঢাকা থেকে দাম্মামগামী বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটও স্থগিত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ফ্লাইটটির বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও সময়সূচি ১৩ অক্টোবর (আজ) দুপুর ১২টার দিকে জানানো হবে। এর আগে রোববার দাম্মাম বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একই ফ্লাইট কাতারের দোহায় অবতরণ করে। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর বিমানবন্দরটি চালু হলে ফ্লাইটটি নিরাপদে দাম্মামে পৌঁছে।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যেও সৌদি আরবগামী ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিতের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ইতিহাদ এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাইও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। এদিকে মার্কিন ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) সামরিক তৎপরতা ও নেভিগেশন ব্যবস্থায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বিবেচনায় সৌদি আকাশসীমা ব্যবহারে মার্কিন এয়ারলাইনসগুলোকে সতর্ক করেছে।