দেশের একমাত্র আইসিটিনির্ভর পলিটেকনিক ‘ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট’। এটি ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা থাকায় প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আইসিটি শিখতে আসত। তবে বর্তমানে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাবে প্রতিষ্ঠানটির সে আগের জৌলুস আর নেই। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো খেলার মাঠও। ৬৩ জন শিক্ষকের পদ থাকলেও মাত্র ১৮ জন দিয়ে টেনেটুনে চলছে পাঠদান। বছরের পর বছর সংকট না কাটায় প্রতিষ্ঠানটি তার বিশেষত্ব হারাতে বসেছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামোগত সংস্কার করা হলে এটি আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, ফেনী শহরতলীর রানীরহাটের পশ্চিম পাশে দুই একর জমির ওপর ২০০৩ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০০৬ সালের ৭ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। ওই বছরই ডেটা টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি শুরু হয়। পরে টেলিকমিউনিকেশন টেকনোলজিতেও ডিপ্লোমা চালু করা হয়। চাপ বেশি থাকায় একপর্যায়ে দ্বিতীয় শিফটও চালু করা হয়েছিল।
এ প্রতিষ্ঠানে পড়া শিক্ষার্থীরা বর্তমানে দেশের আইসিটি সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। অনেকে উদ্যোক্তা হয়ে সরকারি ডিজিটাল কার্যক্রমে ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে তিনটি বিষয়ে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সে ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। মূল ক্যাম্পাসে রয়েছে পাঁচতলা ভবন, শ্রেণীকক্ষ, লাইব্রেরি, আধুনিক ওয়ার্কশপ ও কম্পিউটার ল্যাব। প্রতি বছর প্রায় ৩০০ জন ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। এছাড়া ১২০ আসনের ছাত্র হল, ৮০ আসনের ছাত্রী হল ও একটি প্রশাসনিক ভবন রয়েছে।
জনবল সংকটে প্রতিষ্ঠানটি এখন ধুঁকছে। ৬৩ জন শিক্ষকের জায়গায় কর্মরত আছেন মাত্র ১৮ জন। খালি রয়েছে ৪৫টি পদ। এর মধ্যে দুজন উপাধ্যক্ষের পদই খালি। চিফ ইনস্ট্রাক্টরের ১০টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র দুজন। ২৬ জন ইনস্ট্রাক্টরের জায়গায় পাঁচজন ও ২৬ জন জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টরের স্থানে ১১ জন কর্মরত।
অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৯৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৫ জন। ৭৪টি পদ খালি পড়ে আছে। ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরের ৬৮টি পদের মধ্যে আছেন মাত্র ১০ জন। পোস্ট থাকলেও বছরের পর বছর পদায়িত হননি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট, হিসাবরক্ষক, স্টোর কিপার, ড্রাফটম্যান, অফিস সহকারী, ক্যাশ সরকার, সহকারী বাবুর্চি, বুক সর্টার ও গার্ডেনার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, ২০১২ সালে শুরু হওয়া স্কিলস ফর ইমপ্লিমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম প্রজেক্টটি ২০১৯ সালে শেষ হলে ১৫ শিক্ষককে এখানে সংযুক্ত করা হয়। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত তাদের বেতন দেয়া হলেও ছয় বছর ধরে তা বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান থেকে যৎসামান্য ভাতা দেয়া হলেও তাতে যাতায়াত খরচও ওঠে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দুজন শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। বাকি ১৩ শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এছাড়া জমির আইনি জটিলতাও রয়ে গেছে। সওজ থেকে দুই একর জমি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দেয়া হলেও কবুলিয়ত দলিল হয়নি। খেলার মাঠের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত এক একর জমি বরাদ্দের অভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কলেজের সামনে নেই কোনো যাত্রী ছাউনি। ফলে রোদ-বৃষ্টিতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরিবহনের অপেক্ষা করতে হয় শিক্ষার্থীদের। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে ডেটা টেলিকমিউনিকেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং টেকনোলজিতে ভর্তি বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, ইলেক্ট্রিক্যাল ও সিভিল টেকনোলজি চালু করলে কলেজটির গুরুত্ব আরো বাড়ত।
ইনস্টিটিউটের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের এখানে সমস্যার অন্ত নেই। সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। খেলার মাঠ না থাকায় খেলাধুলার সুযোগ নেই। এছাড়া ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১৩০ জন আবাসিক সুবিধা পায়। বাকিদের মেসে থেকে নানা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়।’"
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ‘বেগম জিয়ার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি এটাকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সরকার রাজনৈতিক কারণে এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার এটিকে বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবে।’
ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী প্রদীপ্ত খীসা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০০৬ সালে উদ্বোধনের সময় এটি দেশের একমাত্র আইসিটিনির্ভর প্রতিষ্ঠান ছিল। এটিকে মডেল করার উদ্যোগ নেয়া হলেও গত ২১ বছরে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। শিক্ষক ও জনবল সংকটে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি এবং সহানুভূতি পেলে প্রতিষ্ঠানটির সব সমস্যা সমাধান হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানের পলিটেকনিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।’