সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠিতব্য নবম ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এফআইআই) সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২৭ থেকে ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সৌদি সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি অংশ নেবেন বলে সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গত ২৭ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার হাতে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে পাঠানো এ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহ। ওই সাক্ষাতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তখন জানিয়েছিল তিনি সৌদি সরকারের আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
সৌদি আরব সফর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সফরপূর্ব অগ্রিম দল আগামী ২৫ তারিখ সৌদি আরব যাওয়ার কথা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সফরসূচি মূলত ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর। তিনি ২৬ তারিখ রাতে রওনা হতে পারেন। এ সম্মেলনে অন্যান্য দেশ থেকে কারা অংশ নিচ্ছেন, সেই চূড়ান্ত তালিকা এখন পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসেনি। সৌদিপক্ষের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। এর উত্তরে সৌদিপক্ষ একটি তালিকা দেবে। তারপর আমরা কল-অন বৈঠকের জন্য কোন কোন দেশের সঙ্গে আলোচনা করব তা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করব।’
একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, সফরে সৌদি আরবের বাদশা সালমানের সঙ্গে কল-অন বৈঠক চাওয়া হয়েছে, যা এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদিপক্ষকে জানানো হয়েছে। সাধারণত সম্মেলন বা সামিটের মতো আয়োজনে সাক্ষাৎ হলে পৃথকভাবে এ রকম কল-অন বৈঠক দিতে চায় না কোনো দেশ। তাই বাংলাদেশ থেকে কল-অন বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলমান রয়েছে।
বাদশা সালমানের সঙ্গে কল-অন বৈঠকটি ছাড়া সৌদি আরব সফরকে ঘিরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বৈঠক করা—এ তথ্য উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, দেশটিতে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশ। তাই দেশটির পররাষ্ট্র ও শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে কল-অন বৈঠক চাওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত এ সফরকে ঘিরে মন্ত্রণালয়ের কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ বা এ-সংক্রান্ত কোনো তৎপরতা নেই। ইরাকের সঙ্গে একটা বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সে বিষয়ে তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই।
জানা গেছে, ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ শীর্ষক সম্মেলনটি মূলত ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও পরিকল্পনাবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার। এ সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন ‘কি-নোট স্পিকার’। এটা বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের এফআইআই সম্মেলনে আমন্ত্রণ পাওয়ার প্রথম ঘটনা।
এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘দ্য কি টু প্রসপারিটি: আনলকিং নিউ ফ্রন্টিয়ার্স অব গ্রোথ’, যার আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক সহযোগিতা বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বের নানা প্রান্তের রাষ্ট্রনেতা, অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা এতে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
রিয়াদভিত্তিক ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ইনস্টিটিউট একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা সৌদি আরবের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা, উদ্ভাবন, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও টেকসই বিনিয়োগ বিষয়ে কাজ করে।
এফআইআই সম্মেলনকে বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন ও মানবসম্পদে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়। এখানে প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, শীর্ষ নির্বাহী, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে আলোচনা করেন।
ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বক্তাদের তালিকায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ‘বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা’ পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়েবসাইটে তাকে আসন্ন সম্মেলনের নির্বাচিত বক্তাদের মধ্যে একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের সাইটে তাকে নোবেলজয়ী সমাজ উদ্যোক্তা ও টেকসই বিনিয়োগ ধারণার প্রবর্তক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টার এ সৌদি সফর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগমুখী অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি জোরদার করবে। একই সঙ্গে দেশীয় উদ্ভাবন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বৈশ্বিকভাবে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করবে।
এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ১৪টি বিদেশ সফর সম্পন্ন করেছেন। সর্বশেষ ইতালির রাজধানী রোমে দুইদিনের সরকারি সফর শেষে তিনি গতকাল সকালে দেশে ফিরেছেন। এ সফরে ড. ইউনূস জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম’-এর ফ্ল্যাগশিপ ইভেন্টে অংশ নেন। তিনি ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামের মূল অধিবেশনে একজন আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগদানের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে যান ড. ইউনূস। সর্বশেষ গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনেও তিনি অংশ নেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে অংশ নেন। ওই সময় তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।
মিসরের কায়রোয় গত বছরের ১৮-২০ ডিসেম্বর ডি৮ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওই সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তব্য দেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে এ বছরের ২১-২৫ জানুয়ারি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিয়ে ড. ইউনূস সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্বের বেশ কয়েকজন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটে যোগ দেন ড. ইউনূস। সামিটের ফাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। চলতি বছরের ২৬-৩০ মার্চ চীনের হাইনান প্রদেশ ও রাজধানী বেইজিং সফর করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় তিনি হাইনানে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া সম্মেলনে যোগ দেন। পরে বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন ড. ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা গত ৩ ও ৪ এপ্রিল বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেন। এ সময় তিনি থাইল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২১-২৫ এপ্রিল কাতারের রাজধানী দোহায় আর্থনা সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের ফাঁকে কাতার ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন শেখ মোজা বিনতে নাসেরের সঙ্গে বৈঠক করেন। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টা কাতার ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারপারসন শেখ থানি বিন হামাদ বিন খলিফা আল-থানির সঙ্গেও এক বৈঠকে যোগ দেন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২৬ এপ্রিল কাতার থেকে ভ্যাটিকান সিটিতে পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেন। সেখানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা কার্ডিনাল সিলভানো মারিয়া তোমাসি ও কার্ডিনাল জ্যাকব কুভাকাড।
জাপানের টোকিওতে চলতি বছরের ২৮ মে থেকে ১ জুন ৩০তম নিক্কেই ফোরাম ফিউচার অব এশিয়া সম্মেলনে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা। ৩০ মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
প্রধান উপদেষ্টা ১০-১৩ জুন লন্ডন সফর করেন। সফরকালে তিনি রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে বাকিংহাম প্যালেসে একান্ত বৈঠক করেন। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও তার একান্ত বৈঠক হয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে গত ১১-১৩ আগস্ট দেশটি সফর করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়সহ একাধিক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়।