চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খামার

রুগ্‌ণ খামার সংস্কার না হওয়ায় কমছে মুরগির বাচ্চা উৎপাদন

সরকারিভাবে মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগি খামারে ১৯৫৭ সালে নির্মাণ করা হয় ১২টি শেড।

সরকারিভাবে মুরগির বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগি খামারে ১৯৫৭ সালে নির্মাণ করা হয় ১২টি শেড। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সংস্কার না করায় নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে তিনটি শেড। বাকি নয়টি শেড জোড়াতালি দিয়ে চলছে মুরগির লালন-পালন। বেসরকারি খামারে মুরগির উৎপাদন বাড়লেও পর্যাপ্ত বাজেট না থাকা, শেড সংস্কার না করাসহ বিভিন্ন সংকটে ধুঁকছে সরকারি এ খামার। অর্ধযুগ আগেও যেখানে ৫ লাখ ২৫ হাজার মুরগি উৎপাদন হতো, এখন তা নেমেছে ৪ লাখ ৮৭ হাজারে। নতুন করে খামারের শেডগুলো সংস্কার এবং বাজেট বাড়ানো না গেলে উৎপাদন আরো কমবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে মুরগি বা ডিমের চাহিদা বাড়লেও সরকারি খামারগুলোর অবস্থা বেশ রুগ্‌ণ। এর মধ্যে চট্টগ্রামের খামারও রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে মাংস, ডিম বা বাচ্চা উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সেখানে সরকারি খামারগুলো সনাতন পদ্ধতিতে খামার পরিচালনা করছে। সরকারি খামারগুলোয় বাচ্চা বা ডিমের দাম কম হলেও চাহিদা বেশি থাকায় উৎপাদন বাড়াতে পারছে না সরকারি খামারগুলো। মুরগির খামারগুলোর আধুনিকায়ন হলে মুরগি ও ডিম উৎপাদন বাড়বে কয়েক গুণ।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগি খামার কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ফাউমি, সোনালি ও রেড আইল্যান্ড, রেড চিকেন—এ তিন জাতের মুরগি পালন ও ডিমের জন্য ১২টি শেড নির্মাণ করা হয় ১৯৫৭ সালে আঞ্চলিক খামার প্রতিষ্ঠার সময়। যার মধ্যে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে নয়টি। পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে তিনটি শেড। আরো কয়েকটি শেডের অবস্থা নাজুক। চালু থাকা শেডের মধ্যে মুরগি পালনের আছে চারটি। বাড়ন্ত মুরগি পালনের শেড রয়েছে তিনটি ও বাচ্চা মুরগি পালনের শেড রয়েছে মাত্র দুটি। নয়টি শেডের মোট আয়তন প্রায় ৩৯ হাজার ১৯৮ বর্গফুট। সর্বশেষ তিন অর্থবছরে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগির খামারের বাজেট বরাদ্দ ছিল ৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগি খামারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয় ৬ লাখ ৪২ হাজার ৫১৮টি এবং বাচ্চা উৎপাদন হয় ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯০৫টি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫০টি। বাচ্চা উৎপাদন হয় ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮৬টি। কভিড সংক্রমণে বাচ্চা ও ডিম উৎপাদনে বড় ধাক্কা খায় খামার কর্তৃপক্ষ। একই সময় খামারের প্রায় তিনটি শেড অকেজো হয়ে যাওয়ার কারণে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এ সময়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৩৭৭টি। বাচ্চা উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬০টি। ২০২১-২২ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৭৭৬টি ও বাচ্চা উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯০টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয় ৮ লাখ ১৪ হাজার ৩৫১টি। বাচ্চা উৎপাদন হয় ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭০টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার পিস ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৮৭ হাজার।

সরেজমিনে মুরগির খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারে থাকা ১২টি শেডের মধ্যে তিনটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাকি নয়টি শেড সংস্কার করে ব্যবহারোপযোগী করা হয়েছে। যদি খামারের ভেতরে নতুন করে অবকাঠামোগত সংস্কার করা যায় তাহলে বর্তমান ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মুরগি পালন সম্ভব বলে জানান কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মুরগি খামারের সদ্য সাবেক উপপরিচালক এবং বর্তমান জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্মকর্তা মো. আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত সরকারি পর্যায়ে মুরগি খামারের অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য একটু আলাদা। ফাঁকা জায়গা, লোকালয় ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ থাকার কথা। কিন্তু ১৯৫৭ সালের খামারটি এখন আর সেই পরিবেশে নেই। এ কারণে বাচ্চা উৎপাদনে বড় একটি প্রভাব পড়ে। আশপাশে বসতি থাকায় সংকট বেড়েছে। এ পরিবেশে মুরগি পালন সেভাবে না হলেও আমাদের করতে হচ্ছে। মুরগির লালন-পালনের যে শেড রয়েছে সেগুলো পুরনো। তিনটি শেড বন্ধ। বাকিগুলো জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। বাজেট বরাদ্দও কম। এত কিছুর মাঝেও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। একটি নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। যাতে হাতের স্পর্শ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ হবে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে খামারের উৎপাদন বাড়বে।’

খামারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী বাচ্চা উৎপাদন সংকটের মধ্যে পড়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বাচ্চা উৎপাদন হলেও গত দুই অর্থবছরে সেটিও কমেছে। শেডগুলো পুরনো মডেলের হওয়ায় এবং কয়েক দফা সংস্কারের কারণে শেডের শতভাগ ব্যবহার সম্ভব হয় না। তাছাড়া প্রায় ৪ দশমিক ৮৭ একরের মুরগি খামারের অনেক জায়গা এখন অব্যবহৃত। জায়গা থাকলেও নতুন শেড নির্মাণের পরিকল্পনা না থাকায় যে পরিমাণ মুরগি পালন সম্ভব, সেটা হচ্ছে না। চট্টগ্রাম মুরগি খামারের জন্য যে বাজেট দেয়া হয় সেটিও কম। অর্থ ও পরিকল্পনার অভাবে খামারটি যুগোপযোগী করা সম্ভব হয়নি।

আরও