খাবার সরবরাহ নেই

পাঁচ মাস রোগী ভর্তি বন্ধ রংপুর বিভাগের একমাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতালে

রংপুর নগরের আমবাড়ি এলাকার আব্দুল কুদ্দুস (৬৫) ও তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম (৬০) দুজনই যক্ষ্মায় আক্রান্ত।

রংপুর নগরের আমবাড়ি এলাকার আব্দুল কুদ্দুস (৬৫) ও তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম (৬০) দুজনই যক্ষ্মায় আক্রান্ত। জটিল অবস্থায় থাকা এ দম্পতি চিকিৎসার জন্য রোববার তাজহাট এলাকায় ২০ শয্যা বিশিষ্ট বক্ষব্যাধি হাসপাতালে আসেন। আউটডোর ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওষুধ পেলেও হাসপাতালে তাদের ভর্তি করা হয়নি। শুধু এ দম্পতি নয়, যক্ষ্মা আক্রান্ত অনেক জটিল রোগীকে এভাবে ফিরে যেতে হচ্ছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, খাবার সরবরাহ বন্ধ থাকায় চলতি বছরের জুন থেকে রোগী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে বক্ষব্যাধির রোগীরা হাসপাতাল চত্বরে পরিচালিত ক্লিনিক থেকে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।

আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি দিনমজুর। এখন ঠিকমতো কাজও করতে পারি না। উপার্জন নেই। অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটে। ডাক্তার বলেছেন পুষ্টিকর খাবার খেতে। কিন্তু সামর্থ্য কোথায়? হাসপাতালে ভর্তি হলে ভালো চিকিৎসা পেতাম। এখন তো ভর্তিই হতে পারছি না।’

রওশন আরা বলেন, ‘ক্লিনিক থেকে ওষুধ পেলাম, কিন্তু পুষ্টিকর খাবার পাব কোথায়? ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেব, এ আশা নিয়েই এসেছিলাম।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নগরের তাজহাট এলাকায় ১৯৬৫ সালে স্থাপিত হয় রংপুর বিভাগের একমাত্র বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি। ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের একতলা ভবনে ছয়টি কক্ষ রয়েছে। আলাদা একটি নারী ও দুটি পুরুষ ওয়ার্ডও রয়েছে। নারী রোগীদের জন্য চারটি ও পুরুষ রোগীদের জন্য ১৬টি শয্যা রয়েছে। বাকি তিনটি কক্ষ ব্যবহার হয় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বসার ঘর ও অফিশিয়াল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। হাসপাতালে দুজন মেডিকেল অফিসার, পাঁচজন নার্স, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন ওয়ার্ড বয় ও একজন মশালচি রয়েছেন। আধুনিক এক্স-রে মেশিন, জিন এক্সপার্ট মেশিন ও মাইক্রোস্কোপ থাকলেও এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসার জন্য ভর্তি হওয়া যায় না।

হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০১৯ সালের আগে যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ইনজেকশননির্ভর ছিল। তখন ২০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ভরা ছিল। এখন যক্ষ্মা রোগীদের ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় না। শুধু ওষুধ দেয়া হয়। ফলে অনেক রোগী এখন আর হাসপাতালে ভর্তি হতে চায় না। তবে ভর্তি হওয়ার প্রবণতা কমলেও এখনো অনেক দরিদ্র রোগী এখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে থাকে।’

বর্তমানে রোগী ভর্তি বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খাবার সরবরাহ বন্ধ থাকায় কোনো রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৩০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গতকালও আউটডোরে নতুন ১৩০ জন ও পুরনো ২৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় মাসে রংপুর জেলায় বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৬২১ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৮২৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় যক্ষ্মা ধরা পড়েছে। তারা নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। বর্তমানে ৬৬ জন রোগীর অবস্থা জটিল। একজন রোগী এমডিআর (মাল্টিপল ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট) টিবিতে আক্রান্ত, যার চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ইনডোর সেবা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ভর্তি না হওয়ায় তারা সবাই বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স জানান, কার্যাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে পুনরায় খাবার সরবরাহ করতে নারাজ জেলা সিভিল সার্জন। রোগী ভর্তি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় নতুন করে খাবার সরবরাহের জন্য টেন্ডার করবেন, সেটিও করতে পারছেন না।

হাসপাতালের অফিস সহকারী রুহুল আমিন বলেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাবার টেন্ডার করা না হওয়ায় এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগে মুন্নি এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ করত। তবে তার কার্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জেলা সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। পাঁচ-ছয়জন যক্ষ্মা রোগী ভর্তি হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু খাবার না থাকায় তাদের ভর্তি নেয়া হয়নি।’

অবশ্য চিকিৎসকরা বলছেন, যক্ষ্মা আক্রান্ত হলে শুধু ওষুধ সেবন করলেই হবে না, পুষ্টিকর খাবারও খেতে হবে নিয়মিত। তাহলেই যক্ষ্মা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু প্রান্তিক মানুষের পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। যক্ষ্মায় জটিলভাবে আক্রান্ত অনেক রোগীর ইনডোর চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। ভর্তি বন্ধ থাকায় তারা সেই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

নগরীর রেল গেট এলাকার মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি যক্ষ্মা আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য তিনি যোগাযোগ করেন। তবে বর্তমানে ভর্তি বন্ধ রয়েছে বলে তাকে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শামছুল আলম বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী নেই। তাই আমাদের কাজও নেই। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যে রোগীরা চিকিৎসা নিতেন, তারা সবাই প্রান্তিক মানুষ। পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।’

আরও