আর সেটি পর্যায়ক্রমেই বাড়ছে বলে লন্ডনভিত্তিক বৈশ্বিক গ্যাস শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের (আইজিইউ) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি ৩২ শতাংশ বেশি হয় বলে সংস্থাটির প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যা পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অস্বীকার করেননি। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি মোকাবেলায় এলএনজি আমদানি বেড়েছে।
আইজিইউর তথ্য অনুসারে, এলএনজি সরবরাহ করে বিশ্বের এমন উৎস ও হাব হিসেবে পরিচিত দেশগুলো থেকেই বাংলাদেশে বাড়ছে জ্বালানিটির আমদানি। ২০২৫ সালে বিশ্বের ১২টি দেশ থেকে বাংলাদেশে এলএনজি এসেছে। আমদানীকৃত এ গ্যাসের পরিমাণ ৭ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন টন। এর আগে ২০২৪ সালে আমদানি করা হয় ৫ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন টন এলএনজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১ দশমিক ৯১ মিলিয়ন টন বেশি আমদানি করা হয়।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এলএনজি আমদানি হয়েছে ১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন টন, যা বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবারই সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে এশিয়ার বৃহৎ আমদানিকারক দেশ চীন, ভারত ও পাকিস্তানের এলএনজি আমদানি একই সময়ের ব্যবধানে কমেছে। চীন ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আমদানি কমিয়েছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ, ভারত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ও পাকিস্তান ১০ দশমিক ৫ শতাংশ আমদানি কমিয়েছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে এলএনজি আমদানি করেছে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে উপসাগরীয় দেশ কাতার থেকে। দেশটি থেকে এলএনজি আমদানি হয়েছে ৪ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন। কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি চুক্তি রয়েছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের কাতার এনার্জির সঙ্গে পেট্রোবাংলার এলএনজি আমদানি চুক্তি সইয়ের পর থেকে কম-বেশি প্রতি বছর ৪০ কার্গো এলএনজি আসে দেশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাতার থেকে ৪০ কার্গো এলএনজি এসেছে দেশে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়েছে কাতার এনার্জি। কারণ দেশটির বৃহৎ এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ উৎস থেকে চুক্তির সব কার্গো আমদানি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়ন প্রতিবেদন অনুসারে, কাতারের পর দ্বিতীয় এলএনজি সরবরাহকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। দেশটি থেকে ১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আঙ্গোলা থেকে দশমিক ৭ মিলিয়ন টন, অস্ট্রেলিয়া থেকে দশমিক ২৯ মিলিয়ন টন, গিনি থেকে শূন্য দশমিক ১২ মিলিয়ন টন, ইন্দোনেশিয়া থেকে দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন টন, মালয়েশিয়া থেকে দশমিক ১৩ মিলিয়ন টন, আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে দশমিক ৩০ মিলিয়ন টন, নাইজেরিয়া থেকে দশমিক ১৪ মিলিয়ন টন, রাশিয়া থেকে শূন্য দশমিক ৩ মিলিয়ন টন, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাকো থেকে দশমিক ৮ মিলিয়ন টন এবং পুনরায় রফতানি গ্রহণকৃত এলএনজি দশমিক ৫৪ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ।
বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে চলতি বছর এলএনজি আমদানি দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে কমে যাবে। যুদ্ধের কারণে কাতারের এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৫০ শতাংশ কম কার্গো সরবরাহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যদিও তারা এখন পর্যন্ত লিখিতভাবে পেট্রোবাংলাকে কিছু জানায়নি। তবে তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদে কার্গো সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার এ পরিস্থিতি থাকতে পারে।’
দেশে স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ সংকটে ঘাটতি মোকাবেলায় পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানি করছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরবরাহ যতটুকু কমে যাচ্ছে তার বিপরীতে আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে সরবরাহ পূরণ করা হচ্ছে। যে কারণে পর্যায়ক্রমে এলএনজি আমদানি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়নের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে এনজি আমদানি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। বিপরীতে এ ঘাটতি গ্যাস আমদানি করে মেটাতে হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানি করে হলেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে, যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ১১৩ কার্গো এলএনজি এসেছে দেশে। এর মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে ৫০ কার্গো এলএনজি, যার মধ্যে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ৩১ কার্গো কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) একেএম মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় গ্যাসের যতটুকু ঘাটতি হচ্ছে তা পূরণ করার জন্য স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা চায় গ্যাসের যাতে কোনো ঘাটতি না হয়। এর জন্য সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির অর্থও পাওয়া যাচ্ছে। গত অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনায় ভর্তুকির এ বরাদ্দ বেড়ে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ১১৫ কার্গো এলএনজি কেনার কথা রয়েছে। ফলে এলএনজি আমদানি পর্যায়ক্রমে বাড়বে স্থানীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের জন্য।’