তবে কর্মী কমলেও কমেনি উৎপাদন। বরং উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। একই সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে এখন আগের তুলনায় বেশি পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক সিস্টেম এবং বিভিন্ন ধরনের অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার।
এটি শুধু একটি কারখানার চিত্র নয়। দেশের শিল্প খাতে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে উৎপাদনের ধরন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের মতো বড় শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ছে, অন্যদিকে একই পরিমাণ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হচ্ছে তুলনামূলক কম শ্রমিক।
এ বাস্তবতায় আগামী পাঁচ বছরে নতুন করে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সরকারের যে পরিকল্পনা, তা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে যে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে সংশয়।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে সরকার একটি পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এ পরিকল্পনা চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত এ কৌশলগত কাঠামোয় আগামী পাঁচ বছরে নতুন করে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক কোটির মধ্যে শিল্প খাতেই সৃষ্টি করতে হবে প্রায় ৩৩ লাখ ২০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান। এর মধ্যে উৎপাদনমুখী শিল্পে ২২ লাখ ৮০ হাজার এবং নির্মাণসহ অন্যান্য শিল্পে ১০ লাখ ৪০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য। অর্থাৎ সরকারের এ পরিকল্পনার একটি বড় অংশের সফলতা নির্ভর করছে শিল্প খাতের ওপর।
দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের সবচেয়ে বড় দুটি ভিত্তি হলো বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত। বস্ত্র খাত তুলনামূলকভাবে পুঁজিঘন হলেও তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমঘন শিল্প হিসেবে পরিচিত। কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, রফতানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, উৎপাদন খরচ কমানো, দ্রুত পণ্য সরবরাহ এবং মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তায় তৈরি পোশাক খাতেও দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার। স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন, ডিজিটাল প্যাটার্ন তৈরি, রোবটিক সিস্টেম, উৎপাদন পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় মান নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অনেক কাজ এখন কম সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়ছে না কর্মসংস্থান, বরং তা কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আরএমজি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের বাস্তবতা খুব বেশি নেই। বরং এ খাতে লোকবল কমে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে অনেক লোক কমে গেছে। আমাদের কোম্পানিতে ১৬ হাজার কর্মী ছিল, এখন আছে সাড়ে ১৩ হাজার। এ খাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, আমাদের মেশিনগুলো সব এআই প্রযুক্তির, অর্থাৎ এআই সাপোর্টিং মেশিন। আর আমাদের অফিসে সবকিছুই অটোমেশন। এসব কারণে অফিসেও লোকবল কমে যাচ্ছে। তাতে কিন্তু প্রডাকশন কম হচ্ছে না, বরং আগের চেয়ে বেড়েছে। মাঝারি থেকে বড় সাইজের ফ্যাক্টরি, আমরা কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। আবার সবাই যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এমনটিও নয়, কারণ এটা অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু যারা ব্যবহার করছে, তাতে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে।’
দেশের শ্রমবাজারে এখন একটি বড় বৈপরীত্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে সেবা খাতের আকার দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর কর্মসংস্থানহীন থেকে যাচ্ছে। অর্থনীতির আকার ও সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলেও সে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ দেশের মোট বেকারের একটি বড় অংশই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করার অপেক্ষায় থাকা তরুণ। প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক শিক্ষা শেষ করে এসব তরুণের কর্মজীবনে প্রবেশ করার কথা থাকলেও চাকরির বাজারে পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তাদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে বেকার থাকছেন। আবার প্রতি বছরই বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে আরো বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী। ফলে শিক্ষিত বেকার কমার পরিবর্তে শ্রমবাজারে তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে এ ব্যবধান যত বাড়ছে, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জও তত জটিল হচ্ছে। শুধু নতুন চাকরি সৃষ্টি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সেই চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং চাকরিপ্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যেও সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে হবে।
জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে এখনো যেসব শিল্পায়ন হচ্ছে, সেগুলো শ্রমনির্ভর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। অন্যান্য শিল্পেও প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিয়োগের বিষয়টি সেভাবে আসেনি। আমরা প্রাক্কলন করছি, আগামীতে কর্মসংস্থানের বেশি প্রয়োজন হবে সেবা খাতে। কারণ খাতটি অনেক বড়, সেখানে এখনো বহু শ্রমিকের প্রয়োজন। তাছাড়া আমরা এখনো ওই পর্যায়ে যাইনি যে নতুন কোনো প্রযুক্তি এসে ব্যাপকভাবে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে। আমাদের শিল্পায়নের সঙ্গে আমাদের অ্যাডজাস্ট করাটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগামী পাঁচ বছরে কী হয় সেটা বলা কঠিন। এ মুহূর্তে হয়তো এনার্জি ক্রাইসিস বা অন্য কোনো সমস্যা চলছে। কিন্তু এগুলো তো সবসময় থাকবে না। সুতরাং অর্থনীতি যদি ঘুরে দাঁড়ায়, যেটাকে আমরা রিকভারি স্তর বলছি, সেটি হলে অনেক কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে।’
দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা অরো বলেন, ‘কর্মসংস্থান তো আর হঠাৎ করেই হবে না, এর সঙ্গে পুরো ইকো সিস্টেম উন্নত করতে হবে। সেক্ষেত্রে কর্মসংস্থান যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি শ্রমিকের চাহিদাও বাড়াতে হবে। শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। একই সঙ্গে দক্ষতা বাড়ানো, স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, আপ-স্কিলিং, রি-স্কিলিং করতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফ্রেমওয়ার্কে এসব বিষয় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’
এদিকে দেশের অর্থনীতিতে সেবা খাতের অবদান ও আকার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সেবা খাতের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতের আকার ছিল ২৮ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের সেবা খাতের আকার বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেবা খাতে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাতে নতুন করে ৫৮ লাখ ৭০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করবে সরকার।
দেশের সেবা খাতের পরিধি দিন দিন বিস্তৃত হলেও এ খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মপরিবেশ এখনো শোভন কর্মসংস্থানের মানদণ্ডে পৌঁছতে পারেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক-বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ও যোগাযোগ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, আবাসন ও রিয়েল এস্টেটসহ সেবা খাতের অন্তত ২০টির বেশি উপখাত রয়েছে দেশে। এর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ এবং হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিবহন ও সংরক্ষণ খাতে নিয়োজিত জনবলের সংখ্যা ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৮ জন। তবে এসব খাতের বড় অংশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। কর্মীদের অনেকের নেই কাজের নিরাপত্তা, নিয়োগপত্র ও নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার আওতাও সীমিত। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। অনিয়ম, অনানুষ্ঠানিক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় দুর্বলতার কারণে সেবা খাতের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দুর্ঘটনার শিকার হলেও অনেক শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা বা সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবহন খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে টেকসই ও শোভন কর্মসংস্থানে রূপ দিতে হলে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এজন্য একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা সুরক্ষা, নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চালক, সহকারী ও অন্য কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
সরকারের নতুন কর্মসংস্থান ও স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক (১ সেপ্টেম্বর থেকে সম্মাননীয় ফেলোর দায়িত্ব নেবেন) ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের কৌশলপত্রে মূলত দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এখানে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন ছিল। কারণ সরকার যখন এটাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে যাবে, তখন দেশের ভেতর ও বাইরের চলমান বাস্তবতাগুলো উঠে আসবে। আমাদের অর্থনীতির ৫০ শতাংশের বেশি এখন সেবা খাতনির্ভর। এখানে অনানুষ্ঠানিক ও ছোট ছোট অনেক খাত রয়েছে। কিন্তু এগুলো এখনো আমাদের অর্থনীতিতে অতটা বড় হয়ে ওঠেনি। এখন এসব খাতকে আরো বড় করতে হলে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বড় পরিসরে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেবা খাত থেকে যদি আমরা আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণেরও প্রয়োজন হবে—যারা বর্তমানে এসব কাজে যুক্ত আছেন, তাদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
দেশের সেবা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপখাত শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় এ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বেকারত্ব সমস্যা ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ বেকারত্ব কমাতে এবং কর্মহীন মানুষের জন্য নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির কার্যকর ও উৎপাদনশীল ব্যবহার জরুরি। কিন্তু দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা এখনো যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি।
উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পর বিপুলসংখ্যক তরুণের চাকরির বাজারে প্রবেশের কথা থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বড় একটি অংশই বছরের পর বছর ধরে বেকার। ফলে উচ্চ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী দেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির জন্য ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও কওমি মাদরাসা থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তবে দেশের প্রচলিত চাকরির বাজারের সঙ্গে তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার কার্যকর সমন্বয় না থাকায় নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া অনেকেই আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছেন না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ১ ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করলেই একজন ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে গণ্য করা হয় না। অর্থাৎ গত এক মাস কাজের সন্ধানে থাকা কোনো ব্যক্তি সর্বশেষ এক সপ্তাহের মধ্যে মাত্র ১ ঘণ্টার জন্যও মজুরির বিনিময়ে কাজের সুযোগ পেলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বেকার নন। আর যারা গত এক মাস কাজপ্রত্যাশী এবং সর্বশেষ এক সপ্তাহে ১ ঘণ্টার জন্যও মজুরিভিত্তিক কাজের সুযোগ পাননি, মূলত তাদেরই বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বেকারত্বের এ আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সপ্তাহে মাত্র ১ ঘণ্টা কাজ করে কোনো ব্যক্তির পক্ষে এদেশে জীবনধারণ কিংবা পরিবারের ন্যূনতম ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। ফলে কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে বেকারের সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা গেলেও বাস্তবে পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত কাজ না পাওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। এ ধরনের মানুষদের একটি বড় অংশ ছদ্মবেকার বা অপ্রতুল কর্মসংস্থানে নিয়োজিত হিসেবে বিবেচিত। দেশে পছন্দসই বা প্রয়োজনীয় পরিমাণ কাজ না পাওয়া এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। অর্থাৎ তারা কোনো না কোনোভাবে কর্মে নিয়োজিত থাকলেও তাদের কাজ পর্যাপ্ত নয়, আয় অনিশ্চিত এবং কর্মসংস্থান তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়। আনুষ্ঠানিক বেকারত্বের হিসাবের বাইরে থাকা বিপুল এ জনগোষ্ঠীও দেশের শ্রমবাজারের একটি বড় সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের কর্মসংস্থান খাতকে নতুন করে চাপে ফেলছে বহুমুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত আইএলওর ১৬২ নম্বর ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়লেও এর সুফল সব ক্ষেত্রে কর্মীদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার পাশাপাশি যুব ও নারী বেকারত্বের মতো কাঠামোগত সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠছে।
দেশে কৃষি খাতের সঙ্গে জড়িত কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজারে উন্নীত করা হবে। অর্থাৎ এ সময়ে কৃষি খাতে প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য শুধু সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এ খাতে কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত কৃষিশ্রমের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য বিপণন, কৃষি প্রযুক্তি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশও ক্রমে এ খাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এর জন্য সরকারকে শুধু কৃষিতে কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও কৃষিসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য বলছে, দেশের কৃষি খাতে পুরুষ শ্রমিকের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমছে। কৃষিতে নিয়োজিত পুরুষদের একটি বড় অংশ অন্যান্য খাতের কর্মসংস্থানে চলে যাওয়ায় তৈরি হওয়া শূন্যস্থান ক্রমেই পূরণ করছেন নারীরা। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নারী শ্রমশক্তির প্রায় ৭৪ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ফলে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নারীর ভূমিকা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে কৃষিশ্রমে নারীর মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো নিশ্চিত করা না গেলে এ খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
সরকারের নতুন স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন কাজ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে কর্মসংস্থানের বড় অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ত্রিচক্রযানভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা। অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যানগাড়ি চালিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। এ খাতে ঠিক কতজন কর্মী রয়েছেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িত।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মহানগর ও শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ ত্রিচক্রযান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু এ খাতের বড় অংশই এখনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বাইরে। কোথায় ও কীভাবে এসব যান চলবে, কোন সড়কে চলাচলের অনুমতি থাকবে এবং চালকদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে—এসব বিষয়ে এখনো কার্যকর ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খাতকে আনুষ্ঠানিক সেবা খাতের আওতায় আনতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, যান চলাচলের জন্য নির্ধারিত সড়ক এবং চালক ও যানবাহনের নিবন্ধন। পাশাপাশি এ খাতকে রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় এনে চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীদের অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বেশি। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি এসব কর্মীকে সামাজিক নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন পরিকল্পনায় সরকার শিক্ষিত তরুণ এবং নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৮ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মান, আয় এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে এ লক্ষ্যের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশের শ্রমবাজারেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। নতুন এক কোটি কর্মসংস্থানের মূল লক্ষ্যের মধ্যে প্রবাসী কর্মসংস্থানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে বিদেশে কর্মী প্রেরণের বিষয়টিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশে যে সংখ্যক কর্মী পাঠানো হচ্ছে তার পাশাপাশি প্রতি বছর আরো প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার নতুন কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবে আগামী পাঁচ বছরে নতুন করে প্রায় ২৩ লাখ কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে গড়ে প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার কর্মী প্রবেশ করছেন। সরকারের পরিকল্পনায় চলতি অর্থবছর থেকে এ সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ লাখ ৮০ হাজারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান কর্মী প্রেরণের পাশাপাশি প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। তবে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর এ পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়মিত ও অবৈধ অভিবাসন। কর্মসংস্থানের আশায় দালালের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ সাগরপথে কিংবা অনিয়মিত পথে বিভিন্ন দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এর ফলে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কর্মী নিয়োগে নতুন নতুন বাধা তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছরই অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগে বিভিন্ন দেশে আটক হয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে বহু বাংলাদেশীকে। একই কারণে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া। কিন্তু কর্মী প্রেরণে অনিয়ম, শ্রমিক হয়রানি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের অভিযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মী পাঠানো নিয়ে জটিলতা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর মালয়েশিয়ার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হলেও সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকার দেশটির শ্রমবাজারে কর্মী প্রেরণের পথ সুগম করতে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। এরপরও নতুন করে আরো ৪ লাখ ৬০ হাজার কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জিং ও অবাস্তব পরিকল্পনা বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার নতুন করে যে নীতির কথা বলছে সেখানে বছরে ১৫ লাখ কর্মী যাবে বিদেশে। অর্থাৎ বিদ্যমান কর্মীর পাশাপাশি আরো সাড়ে চার লাখের কিছু বেশি কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশকিছু শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার খোলার পথ কেবল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানো কত বাস্তব সেটি বড় প্রশ্ন। এছাড়া বর্তমানে বিদেশে যারা যাচ্ছে, তাদের বড় অংশই অদক্ষ। শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা, ফলে লক্ষমাত্রা কতটা পূরণ হবে, সেটাও আরেকটি প্রশ্ন। সুতরাং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে, কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা আরো অনেকগুলো শর্তের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষতার বিষয়ে যদি বলি, তাহলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মী কমানো, অদক্ষ শ্রমিকদের শোষণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে যেতে হবে।’
দেশের অর্থনীতি সাধারণত ৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি হলে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি ৬ শতাংশে উন্নীত হয়, তাহলে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা করতে হলে অ্যাকশন প্ল্যান নিতে হবে। সাধারণত আমাদের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হলে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। আর প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে উন্নীত হলে, এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কোন দিকে যাচ্ছে তার ওপর। অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে না। পাবলিক খাতের একার পক্ষে এত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।’