পাবনার মানসিক হাসপাতালকে বিশ্বমানের করতে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প

দক্ষ চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে পাবনায় অবস্থিত দেশের প্রথম মানসিক হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় ও উন্নত সেবা দিতে পারছে না। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে বেশির ভাগ রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারছে না হাসপাতালটি।

দক্ষ চিকিৎসক ও জনবলের অভাবে পাবনায় অবস্থিত দেশের প্রথম মানসিক হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় ও উন্নত সেবা দিতে পারছে না। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে বেশির ভাগ রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারছে না হাসপাতালটি। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালটির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাবনা মানসিক হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রূপান্তরে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। আগামীকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাস হতে পারে প্রকল্পটি।

১৯৫৭ সালে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় পাবনা মানসিক হাসপাতাল। শুরুতে এ হাসপাতালের শয্যার সংখ্যা ছিল ৬০, পরবর্তী সময়ে তা ৫০০-তে উন্নীত হয়। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি ও সংস্কারের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে ২০০টির বেশি শয্যা। এছাড়া হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে। ফলে দেশের প্রথম মানসিক হাসপাতালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।

জানা গেছে, নতুন প্রকল্পের অধীন পাবনা মানসিক হাসপাতালকে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক স্নাতকোত্তর পাঠ্যক্রম চালু করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে ছয়তলাবিশিষ্ট বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ নির্মাণ, ছয়তলার ওয়ার্ড কমপ্লেক্স, একটি একাডেমিক ভবন, সাততলাবিশিষ্ট অ্যাটেনডেন্ট হোস্টেল, চিকিৎসক ও কর্মীদের জন্য আটতলাবিশিষ্ট চারটি ভবন, স্নাতকোত্তর ছাত্র ও প্রশিক্ষণার্থীর জন্য ছয়তলাবিশিষ্ট নারী ও পুরুষ হোস্টেল, আটতলাবিশিষ্ট দুটি ডক্টরস ও নার্সেস ডরমিটরি এবং পাঁচতলাবিশিষ্ট মাল্টি ফাংশনাল ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। নির্মিত হবে মসজিদ। ২০২৩ সাল থেকে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য কয়েকবার পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলেও সেটি ফিরিয়ে দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি কমিশনে পাঠানো হলেও ফেরত পাঠানো হয়। চলতি বছর প্রকল্প মূল্যায়ন সভার (পিইসি) সুপারিশ পাওয়ার পর আগামীকাল একনেকে উঠবে প্রকল্পটি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি পাবনা সদরের হেমায়েতপুরে বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. আফরিন মাহমুদ বলেন, ‘পাবনায় আন্তর্জাতিক মানের একটি মানসিক হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা থেকে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে এ অঞ্চলের চিকিৎসাসেবায় বিরাট পরিবর্তন আসবে এবং নতুন চিকিৎসক তৈরি করা সম্ভব হবে। এ প্রকল্পটি বছর দুয়েক আগে থেকে শুরু হয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি, ডিপিপি তৈরি এবং পরিকল্পনা কমিশনের কিছু অবজারভেশন ছিল, যেগুলো ঠিক করতে সময় লেগেছে। এছাড়া অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখানে বর্তমানে যে অবকাঠামো আছে তার অবস্থা খুবই নাজুক। বর্তমানে যে শয্যা আছে সেখান থেকে ৩০০টি নেয়া যাবে এবং ৭০০টি নতুন যুক্ত হবে। এখানে চিকিৎসকরা পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করবেন। এটা ঠিক যে বাংলাদেশে অনেক প্রকল্প দীর্ঘ সময় লাগিয়ে বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু এখানে যেহেতু অবকাঠামো নির্মাণের পর্যাপ্ত জায়গা আছে তাই প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারব।’

প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো অনুমোদন পায়নি। আগামীকাল অনুমোদন পেলে প্রায় ১০ মাস পর অনুমোদন পাবে। ফলে নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারবে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘‌প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া দেখলে দেখা যাবে ১০ মাস এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। অনুমোদন পাওয়ার পর কাজ শুরু করতে যাবে আরো কয়েক মাস। তাহলে কীভাবে তিন বছরে কাজ শেষ হবে। প্রকল্প তো তিন বছর সময় পাচ্ছে না। দেশের অনেক প্রকল্পের মতো এটাও নিশ্চিত ঠিক সময়ে শেষ হবে না।’

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) কাজী দেলোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বাংলাদেশে যখন মানসিক রোগ সম্পর্কে ধারণাই তৈরি হয়নি, তখন থেকে পাবনায় হাসপাতালটি চালু হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের অব্যবস্থাপনায় আমরা এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। এখন মানসিক রোগের পরিধি ও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এটা যদি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান করা যায় তাহলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এখানে এমবিবিএস শেষ করে চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। তবে প্রকল্পে যেন দুর্নীতি-অনিয়ম না হয় সেটি নজরে রাখতে হবে।’

আরও