বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে অন্য চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি ১০ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে।
আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল এ রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রায় ঘোষণা শুরু হয়ে বেলা ১টার দিকে তা শেষ হয়।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীম। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি হলেন নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের ও উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।
খালাস পাওয়া ১০ আসামি হলেন কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আবদুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন এবং তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম।
রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘নিম্ন আদালতের রায়ের বিষয়ে হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। হাইকোর্ট বলেছেন, একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া অনেকটা “মাইন্ডলেস সেন্টেন্স”। নিম্ন আদালতের বিচারক মামুনুর রশিদ কার কীভাবে দণ্ড দেয়া উচিত ও কে কতটুকু ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বিচারক মামুনুর রশিদকে ফৌজদারি মামলার বিচার ও দণ্ড দেয়ার দায়িত্ব থেকে অবিলম্বে সরিয়ে আনতে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলায় মাদরাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি আসামিরা পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন। এসবের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয় গত ২৮ জুলাই। ২০ আগস্ট শুনানি শেষ হলে ২৪ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করা হয়।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা তুলে না নেয়ায় ৬ এপ্রিল মাদরাসার ছাদে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
গতকাল রায় ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। সিরাজ উদদৌলার (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি) জন্য আমার মেয়েকে হারিয়েছি। আজ আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট। আমার মেয়ের আত্মার শান্তি পেয়েছে।’
কান্নায় ভেঙে পড়া শিরিন আক্তার বলেন, ‘আমাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমার ছেলেদের নিয়মিত হুমকি দেয়া হচ্ছে। বাড়িঘরে আগুন দিলে আমাদের কী হবে? আমরা কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেব? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমাদের নিরাপত্তা চাইছি।’