বুকে চেপে ধরে আছেন প্রিয় সন্তানের ছবি। আর অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধা মা গঙ্গাদেবী চাকমা বলছেন, ‘মা, আমি দেশে ফিরলে তোমার আর কোনো কষ্ট থাকবে না। সব অভাব পূরণ করে দেব। তোমাদের জন্য বড় একটি টেলিভিশন কিনে দেব...।’
দেশে ফিরে মায়ের সব অভাব ঘোচানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া ছেলে ফিরছেন ঠিকই, তবে জীবন্ত নয়, নিথর দেহ হয়ে। গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা।
গতকাল রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের দুর্গম রামহরি পাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
জানা গেছে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা (৪০) রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি পাড়ার সুবিমল খীসা ও গঙ্গাদেবী চাকমার সন্তান। তিন সন্তানের মধ্যে ট্রোম্যান খীসা সবার ছোট। তার এক বড়ভাই ও এক বড়বোন থাকলেও পরিবারের প্রধান উপার্জনশীল ব্যক্তি ছিলেন ট্রোম্যান খীসা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ট্রোম্যান ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে দক্ষিণ সুদানে যান তিনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরে মিশন শেষ করে দেশে ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু তার আগেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান তিনি।
সরেজমিনে রামহরি পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ট্রোম্যান খীসার বাড়িতে পাড়া-প্রতিবেশীরা এসেছেন। ট্রোম্যানের বৃদ্ধ মা গঙ্গাদেবী চাকমা (৬৫) সন্তানের শোকে কাঁদছেন। পাড়ার মানুষ তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ছেলেকে হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ট্রোম্যানের বাবা সুবিমল খীসাও (৬৭)।
দুই কন্যার জনক ট্রোম্যান খীসার স্ত্রী শ্রেয়া চাকমা (রূপা) অল্প বয়সেই বিধবা হয়েছেন। বড় মেয়ের বয়স ৮ বছর এবং ছোট মেয়ের বয়স ৫ বছর। ট্রোম্যানের স্ত্রী দুই কন্যা সন্তান নিয়ে চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর স্টাফ কোয়ার্টারে থাকেন। স্বামীর নিথর দেহ দেশে ফিরলে যাবতীয় কার্যক্রম শেষে স্বামীকে নিয়ে রামহরি পাড়ায় ফিরবেন তিনি।
ট্রোম্যানের মা গঙ্গাদেবী চাকমা জানালেন, ‘আমার ছেলের ডিসেম্বরে মিশন শেষে বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু ছেলে আর মায়ের কাছে ফিরল না। আমার নাতি দুটিও ছোট। কী যে হবে তাদের।’
ট্রোম্যান খীসার বাবা সুবিমল খীসা বলেন, ‘বাড়িতে ইন্টারনেট না থাকায় ঘর থেকে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আমাকে দূরে (নেটওয়ার্কযুক্ত স্থানে) গিয়ে ছেলের সঙ্গে কথা বলতে হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ছেলের সঙ্গে ভিডিওকলে সবশেষ কথা বলেছিলাম। দুদিন পর রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ৮টার দিকে ছেলের মোবাইলে কল দিই। কিন্তু সে কল কেউ রিসিভ করছিল না। পরে একজন রিসিভ করে জানায়, আমার ছেলে হাসপাতালে ভর্তি আছে।’
তিনি বলেন, ‘একই সময়ে ফোনে আরো অনেকে ফোন করেন। পরে আমি বড় ছেলেকে ফোন করি। একপর্যায়ে ছেলে আমাকে জানায়, ট্রোম্যান আর নেই। ট্রোম্যানের মা আর আমি দুজনই অসুস্থ। আমার বড় ছেলে প্রথমে জানাতে চায়নি। পরে একপর্যায়ে আমাকে জানায় এবং তার মাকে না জানাতে বলে। অন্যদিকে মৃত্যুর খবর শুনে ওর স্ত্রী মাথা ঘুরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আমি ওই রাতে ঘরে এসে আর ঘুমাতে পারিনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘পরদিন সকালে একসঙ্গে খেতে বসে আমি খেতে পারছিলাম না। তখন ট্রোম্যানের মা দেখল আমি খেতে পারছি না। ওর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তখন সে কান্নাকাটি শুরু করে এবং একপর্যায়ে তাকে বিষয়টি জানানো হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, ট্রোম্যানের মরদেহ দেশে আসতে ২৫ তারিখের মতো লাগবে। এরপর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসবে, চট্টগ্রাম থেকে পরে এখানে আনা হবে। এখানে আনতে ২৭-২৮ তারিখও হতে পারে। ছেলের অকাল মৃত্যুতে ট্রোম্যানের মা ভেঙে পড়েছে। আমরা দুজনই অসুস্থ মানুষ। দুজনের প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা ওষুধ খরচ লাগে। আমার হার্টে রিং বসানো হয়েছে, সব খরচ ট্রোম্যানই দিয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ট্রোম্যানের স্ত্রী বিধবা হলো, ৫ বছর ও ৮ বছর বয়সী দুইটা মেয়ে আছে। এখন তাদের কী হবে, কে দেখবে। আমার ছেলে প্রতি মাসে আমাদের ওষুধের খরচ দেয়, এখন কে দেবে। বড় ছেলে তো এসব দেওয়ার মতো বেতন পায় না। এখন আমাদের সবার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
রামহরি পাড়ার বাসিন্দা ও ট্রোম্যান খীসার বন্ধু জয়েস খীসা বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছি, একসঙ্গে বড় হয়েছি। ছোটকাল থেকেই আমি তাকে ভালো জানি। সে খুবই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তার এমন অকাল মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক। ট্রোম্যানকে তার বাবা-মাকে দেখতে হতো। তাদের দুজনের প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। ট্রোম্যানের বাবা-মা দুজনই ভেঙে পড়েছেন। বিলাপ করছেন।’
রামহরি পাড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, ‘২০ তারিখ বিকেলে ট্রোম্যানের একজন ভাই আমাদের পাড়ার সামনে রাস্তায় ছোটাছুটি করছেন এবং ফোনে কথা বলছেন। পরে ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ট্রোম্যান বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন।’
বুড়িঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান প্রমোদ খীসা বলেন, ‘২০ সেপ্টেম্বর (রোববার) বিকেলে আমরা ঘটনা জানতে পারি। পুত্রশোকে কাতর হয়ে পড়বেন—এ জন্য তার মাকে আমরা এসব কিছুই বলিনি। তাদের আরেকটি বড় ছেলে আছেন, তার আয়-রোজগার কিছুটা কম। ট্রোম্যানই ছিল তাদের ভরসা। চাকরি এখন সোনার হরিণের মতো। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক ভরসা ছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি শুনেছি, সুদান থেকে মরদেহ আসতে ৪-৫ দিন লাগবে। আবার এখানে আসতে আরো একদিন লাগতে পারে।’