আমন মৌসুম

চাহিদামতো মিলছে না সার, কৃষককে কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে

রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটার কৃষক দুলাল হোসেন। আমন ধান রোপণের পর জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার আর পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা তার।

কিন্তু সে কাজ রেখে এখন তাকে ছুটতে হচ্ছে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে, সারের খোঁজে। কৃষি কার্ড নিয়েও অনুমোদিত ডিলারের দোকানে গিয়ে পাচ্ছেন না সার। অথচ একই সার মিলছে বাজারের খুচরা দোকানে, তবে সরকারি দামের চেয়ে বেশিতে।

দুলাল হোসেন বলেন, ‘কৃষি কার্ড থাকার পরও দুবার ডিলারের কাছে গিয়ে সার পাইনি। সরকারি দামে সার নেই। কিন্তু বেশি দিলে ঠিকই খুচরা দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। মূলত ডিলাররা দোকানে সার রাখছেন না। গোপনে অন্যত্র লুকিয়ে রেখে বেশি দামে বিক্রি করছেন।’

শুধু দুলাল হোসেনই নন; রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রংপুর, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের অভিযোগ এখন একই রকম। আমন ধান রোপণ ও পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। কোথাও অনুমোদিত ডিলারের দোকানে ভর্তুকির সার মিলছে না, আবার কোথাও খুচরা দোকানে পাওয়া গেলেও তা কিনতে হচ্ছে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে। বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি বেশি প্রকট বলে অভিযোগ কৃষকদের।

সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সার বিক্রির কথা প্রতি কেজি ২২ টাকা দরে। ৫০ কেজির এক বস্তার দাম ১ হাজার ১০০ টাকা। টিএসপির কেজি ২৭ টাকা, বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ডিএপির কেজি ২১ টাকা, অর্থাৎ ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা। আর এমওপি সারের কেজি ২০ টাকা, বস্তা ১ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত ডিলারের দোকানে সরকারি দামে সার না পেয়ে খুচরা বাজার থেকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপির ৫০ কেজির বস্তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ সরকারি দামের তুলনায় একেকটি বস্তায় বাড়তি দিতে হচ্ছে ৩৫০-৪৫০ টাকা। ডিএপির ক্ষেত্রেও ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতি বস্তায় কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৫৫০-৬৫০ টাকা।

দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আবির আহম্মেদ বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ডিলাররা বলছেন সার নেই, কিন্তু ৫০০-৬০০ টাকা বেশি দিলে ঠিকই সার দিচ্ছে।’ গোদাগাড়ী উপজেলার বসন্তপুর গ্রামের কৃষক ওয়ালিউল্লহর অভিজ্ঞতাও একই। কয়েকবার ডিলারের কাছে গিয়েছেন সার কিনতে, কিন্তু পাননি।

নওহাটা বাজারে বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে গিয়ে ভর্তুকি মূল্যের কোনো সার পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জুলাইয়ে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা এমওপি ও ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছি। অথচ এ অঞ্চলে ৪২টি মৌজার কয়েক হাজার কৃষক রয়েছেন। বরাদ্দ পাওয়া সার দুই-তিনদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, ডিলারদের বরাদ্দের পরিমাণ নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। অনুমোদিত বরাদ্দের বাইরে গিয়ে সার সরবরাহের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বিএডিসির রাজশাহীর সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিলারদের বরাদ্দ কম পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ীই সরবরাহ করি। মন্ত্রণালয় যতটুকু বরাদ্দ দেয়, ততটুকুই দিতে পারি।’

অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি মৌসুম এখন। বর্ষার পানি ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এ সময় ধান রোপণ ও পরিচর্যার কাজ চলে। ধানের কুশি বৃদ্ধি, গাছের স্বাভাবিক বিকাশ এবং ফলন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে সুষম মাত্রায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপিসহ প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে হয়। কৃষকরা বলছেন, সময় পার হয়ে গেলে পরে সার পেলেও তার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়বে না, ফলনেও পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘সারের সংকট নিয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

একই কথা বলেছেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কুষ্টিয়াতেও সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। ডিলারদের কাছ থেকে সার না পেয়ে তারা সাব-ডিলার ও খুচরা দোকান থেকে বাড়তি দামে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। কোথাও সার পাওয়া গেলেও ১০-২০ কেজির বেশি মিলছে না। এতে যাদের বেশি সার প্রয়োজন তারা বিপদে পড়ছেন। আবার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজিতে ৫-১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

কুমারখালীর পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামের কৃষক সামছুল ইসলাম জোহা জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। ইউনিয়নের ডিলারের দোকানে গিয়ে নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার পাননি। পরে সাব-ডিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩২ টাকা, ডিএপি ৩৭ ও টিএসপি ৩৮ টাকা দরে কিনেছেন।

একই এলাকার কৃষক আরিফিন মোল্লার অভিযোগ, ডিলারের কাছ থেকে একসঙ্গে বস্তা ধরে সার দেয়া হয় না। ১৫-২০ কেজি দেয়া হচ্ছে। ফলে তিনি জমিতে ঠিকমতো সার দিতে পারছেন না।

জানতে চাইলে কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, ‘অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে কৃষি কর্মকর্তারা অবস্থান করে সার বিতরণ করবেন।’ কৃত্রিম সংকট ও বেশি দাম নেয়ার মৌখিক অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতারও।

সারের সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগে সোমবার লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান কৃষকরা। প্রায় ২ ঘণ্টা পর উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুলে নেন। কৃষকদের অভিযোগ, টিএসপি ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০, ইউরিয়া সারের বস্তা কিনতে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে তাদের।

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের এরশাদের মোড় এলাকার কৃষক আবু তালেব তার ১০০ শতক জমিতে ধান আবাদ করেছেন। তিনি জানান, ধান আবাদের ১৫-২০ দিনের মধ্যে সার দেয়ার প্রয়োজন হয়। সময়মতো তা দিতে না পারলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিলারের কাছে পটাশ ও ইউরিয়া না পেয়ে তাই বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনেছেন।

বিএডিসি বীজ ডিলার অ্যাসোসিয়েশন রংপুর জেলার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রকৃত কৃষকদের সার না পাওয়ার কথা নয়। পটাশ ও টিএসপির সরবরাহ যথেষ্ট রয়েছে। তবে ডিএপির সরবরাহ কম, এ মাসে তা ঠিক হয়ে যাবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলেও সারের সংকটের অভিযোগ রয়েছে। গত শনিবার সার সংগ্রহ করতে ভোর থেকেই ডিলারদের দোকানের সামনে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন ছিল। একপর্যায়ে সার নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতেই চাহিদা অনুযায়ী তারা সার পাননি। এজন্য সার বিতরণের দিন ভোর থেকে লাইনে দাঁড়ান তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ টনে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ লাখ ২২ হাজার, টিএসপি ৯ লাখ ১ হাজার ৫০০, ডিএপি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ৭০০, এমওপি ৯ লাখ ৭০ হাজার টন। এছাড়া এনপিকেএস (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ ও সালফারের সুষম সার), জিপসাম, জিংক সালফেট, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট, বোরন ও অ্যামোনিয়াম সালফেটের চাহিদা ৯ লাখ ২১ হাজার ৩০০ টন ধরা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট সারের মজুদ ছিল ১৬ লাখের কিছু বেশি।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আমন মৌসুমে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে ঘাটতি কৃষির জন্য উদ্বেগের বিষয়। সময়মতো সার না পেলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বেশি দাম কিনলে কৃষকের ব্যয় বাড়বে। যেটি কৃষক ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করবে।

এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গার অভিযোগ অনুযায়ী সারের সরবরাহ পর্যাপ্ত নেই। কৃষকরা চাহিদামতো সার সংগ্রহ করতে পারছেন না। আমনের মৌসুমে সারের সরবরাহ ঠিক না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সেটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিঘ্ন সৃষ্টি করবে। এতে খাদ্যে আমদানিনির্ভরতা আরো বাড়বে।’

আমনের পর সামনে শীতকালীন সবজির মৌসুম আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে সময় দেশে প্রচুর সবজি চাষ হয়। সারের এ সংকট থাকলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এতে সবজির দামও বেড়ে যাবে। এমনিতেই খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চ। ফলে অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে সবজির দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্দশা আরো বেড়ে যাবে। সে জন্য এখনই পরবর্তী মৌসুমের জন্যও পরিকল্পনা করতে হবে। পাশাপাশি সংকট কমাতে সারের দেশীয় উৎপাদন আরো ত্বরান্বিত করতে হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি মৌসুমে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৭৬২ হেক্টর। বিপরীতে আমনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৫৭৬ টন। এ সময় চাহিদামতো সার না পেলে লক্ষ্যমাত্র অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটিকে ষড়যন্ত্র মনে হয়। সার নেই অভিযোগ আসছে, ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসন যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে বিতরণ করার পরও অতিরিক্ত থাকছে। তখন আর ক্রেতা নেই। কোনো কোনো জেলায় আগের বছরের তুলনায় আমরা বেশি বরাদ্দ দিয়েছি। এর পরও অভিযোগ আসছে সার নেই। প্রশাসন কাজ করছে। যারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।’

সার সংকটের অভিযোগটি সীমান্ত জেলাগুলোয় বেশি পাওয়া যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী আরো বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমার বেশি ভর্তুকি দেই। সেজন্য তাদের দেশের তুলনায় আমাদের এখানে দাম কম। তবে আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই যে সার পাচার হচ্ছে। বিজিবিকে সীমান্তে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে কুষ্টিয়া, রংপুর ও রাজশাহী প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন

আরও