পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও সরবরাহ কমার অজুহাত

মাছ, ডিম, সবজিসহ বেড়েছে প্রায় সব খাদ্যপণ্যের দাম

চলমান জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। গত কয়েক দিনে বাজারে মাছ, শাকসবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য সরবরাহ কমেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের যেসব জেলা থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য আসে সেসব রুটে ট্রাক ভাড়া বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, জ্বালানি সংকটকে পুঁজি করে বাজার অস্থিতিশীল করছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। ভোক্তার স্বার্থরক্ষায় নিয়মিত বাজার তদারকির পরামর্শ তাদের।

জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং লোডশেডিংয়ের কারণে রাজধানীর বাজারে পণ্য সরবরাহ কমেছে। পাইকারি ও খুচরা থেকে সুপারশপ—সবখানেই এমন অবস্থার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার সঙ্গে খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ডিম, মাছ, শাকসবজি, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা ও ফলমূলের দামে বড় প্রভাব পড়েছে। সুপার শপগুলোতেও পণ্য সরবরাহ ৩৫ শতাংশের মতো কমেছে বলে জানা গেছে। তবে কিছুটা স্বস্তিতে মুরগির বাজার।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার, রামপুরা কাঁচাবাজার, হাতিরপুল বাজার, কাজীপাড়া বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে ডজনপ্রতি ডিমের দাম বেড়েছে ১৫-২০ টাকা। এক সপ্তাহ আগে ১১০-১২০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল এলাকাভেদে ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে ১৩৫-১৪০ টাকায়। চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫-৭ টাকা। আটার দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা, ময়দা ৫ ও ছোলা ১০ টাকা।

বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে অভিযোগ অনেক ক্রেতার। খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ই জানিয়েছেন, বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম এবং লিটারে বাড়তি ৫ টাকা পর্যন্ত। বোতলজাত তেল গতকাল বিক্রি হতে দেখা গেছে ১৯৫ টাকায়। পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটার ১৭০ টাকায়। খোলা সয়াবিনের দামও বেড়েছে। প্রতি কেজি সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৫-২২০ টাকায়।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের দৈনিক বাজারদরের প্রতিবেদনেও বাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, মাঝারি চালের (পাইজাম/আটাশ) দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ৬০-৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ২ টাকা, প্যাকেট আটা ও খোলা ময়দা ৫, খোলা সয়াবিন ৩, মানভেদে ছোলা ৫-১০, এলাচ (ছোট) কেজিতে ১০০, ধনে ও তেজপাতা কেজিতে ২০, শসা ১০ ও ফার্মের ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

ক্রেতারা বলছেন, বেশ কিছুদিন থেকে বাজারে সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি। নতুন করে মাছ ও অন্য খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে।

রামপুরা বাজারে চাল ও ডাল কিনতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা সানজিদা পান্না বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে এখন বাছাই করে খাওয়ার মতো আর পণ্য নেই। মাছ, চাল, ডাল, ডিম, মসলার দাম বেড়েছে। গত সপ্তাহে যে মাছ ২৫০ টাকায় কিনেছি সেটি এখন ৩০০ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দিয়ে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম রাখছে।’

গতকাল সরজমিনে বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে রুই মাছ কেজিপ্রতি ৩২০-৫০০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০, চাষের টেংরা ৪০০, পাবদা ৪৫০, পাঙাশ ২২০, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ও ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েকদিনে দাম না বাড়লেও প্রায় সব সবজির দাম ৮০ টাকার ওপরে। ঢেঁড়স ৭০ টাকা, বরবটি ১০০, টমেটো ৮০-১০০, ঝিঙা ১০০, লাউ ৮০, বেগুন ৮০-১২০, পটোল ৮০, চিচিঙ্গা ১০০, করলা ১০০, শিম ১০০-১২০, কাঁকরোল ১২০ ও কাঁচামরিচ ৮০-১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে স্বস্তি ফিরছে মুরগির বাজারে। দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকা মুরগির দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মুরগি ঢাকার আশপাশ অঞ্চল থেকে সরবরাহ করা হয়। এতে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব অন্যান্য পণ্যের তুলনায় কিছুটা কম। গতকাল কারওয়ান বাজারে ব্রয়লার ১৭০ টাকা, সোনালি ৩২০ ও দেশী মুরগি বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকায়।

কারওয়ান বাজারের মুরগি ব্যবসায়ী বোরহান বলেন, ‘মুরগির বাজার কয়েকদিন ধরে স্থিতিশীল। সরবরাহ ঘাটতি নেই। তবে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সামনে মুরগির দামেও পড়তে পারে।’

লোডশেডিংয়ে ব্যয় বাড়ছে খামারিদের। তারা বলছেন, তীব্র গরম থেকে মুরগিকে বাঁচাতে দিনের অনেকটা সময় জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘বাজারে সরবরাহ থাকলেও উৎপাদন আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ফিডের দামের কারণে ছোট উদ্যোক্তারা খামার থেকে সরে যাচ্ছে।’

পরিবহন খরচ বৃদ্ধি বাজারে প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে। যশোরের সাতমাইল থেকে ঢাকায় সবজি সরবরাহ করেন কৃষক আশরাফুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতমাইল থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া ৪-৫ হাজার টাকা বেড়েছে।

খুচরা বাজারের মতো পাইকারি বাজারেও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে চাল, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দা, চিনির মতো পণ্যের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা পর্যন্ত বাড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়ানোয় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল খাতুনগঞ্জে পরিশোধিত খোলা পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৬ হাজার ৪০০ টাকায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আগে এর পাইকারি দাম ছিল ৬ হাজার ৩০০ টাকা। সুপার পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ থেকে ৬ হাজার ৬৫০ ও সয়াবিন ৭ হাজার ৪০০ টাকায়। অন্যদিকে, সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে মণপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ৯০-১০০ টাকা। গমের দাম বেড়েছে মণপ্রতি ৩০-৪০ টাকা।

বাংলাদেশ চিনি ডিলার সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে চিনির দাম কমে স্থিতিশীল ছিল। জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আবার দাম বাড়তে শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে আটা, ময়দা, খোলা ভোজ্যতেল, চিনি, মোটা ও মাঝারি চাল ও মসলাপণ্যের দাম বেড়েছে। পেঁয়াজ, শুকনা মরিচ, শুকনা আস্ত হলুদ ও আমদানীকৃত মসলার দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

খুচরা বাজারের পাশাপাশি সরবরাহ ঘাটতির কথা জানিয়েছেন সুপার শপ-সংশ্লিষ্টরাও। রামপুরা ওয়াপদা রোডের স্বপ্ন আউটলেটের ম্যানেজার জিসান আহমেদ বলেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ পণ্যবাহী গাড়ি আসার কথা তা আসছে না। আগের চেয়ে প্রায় ৩৫ শতাংশ সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। ক্রেতারা এখন কম আসছে।

জ্বালানি তেল ও পরিবহন ভাড়ার চেয়ে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়েছেন বলে দাবি কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইনের। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সবসময় একটা অজুহাত খোঁজেন। জ্বালানি তেল আর পরিবহন ভাড়া যতটুকু বেড়েছে তার চেয়ে কয়েক গুণ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের টার্গেট কোরবানির ঈদ। এখন থেকে দাম বাড়াতে পারলে তখন গিয়ে আর সমস্যা হবে না। এটা ভেবেই তেল, ছোলা, চিনি, আটা, মসলার দাম বাড়ানো হচ্ছে। সংকট যে নেই তা বলছি না। কিন্তু জ্বালানি ও পরিবহনের চেয়ে কয়েক গুণ দাম বেড়েছে।’

বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি না করলে ব্যবস্থা নিতে পারলেও অনির্ধারিত পণ্যে কিছু করা যাচ্ছে না জানিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংকটে দাম বাড়ছে। এটার একটা বাস্তবতাও রয়েছে। তবে আমরা বাজার তদারক করছি। এখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থারও এগিয়ে আসা দরকার। আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি শুধু সরকার যেসব পণ্যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সেগুলোতে। অন্যগুলো তো আমরা চাইলেও পারব না।’

*প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো ও যশোর প্রতিনিধি

আরও