মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নরসিংদীর গৌরবময় অধ্যায়

স্বাধীনতা যুদ্ধে নরসিংদী সদরে ২৭, মনোহরদীতে ১২, পলাশে ১১, শিবপুরে ১৩, রায়পুরায় ৩৭ এবং বেলাব উপজেলায় ১৬ জন শহীদ হন। জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী শত শত নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে গণকবর দেয়।

মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে নরসিংদী জেলায় শতাধিক যুদ্ধ, খণ্ডযুদ্ধ ও অসংখ্য অপারেশন সংঘটিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন ও সশস্ত্র সংঘাতে শহীদ হন জেলার ১১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ও অসংখ্য সাধারণ মানুষ। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী হানাদারমুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে জেলার মানুষ পায় মুক্তির স্বাদ। যদিও সেই পথ ছিল রক্ত, বেদনা ও ত্যাগে ভরা।

স্বাধীনতা যুদ্ধে নরসিংদী সদরে ২৭, মনোহরদীতে ১২, পলাশে ১১, শিবপুরে ১৩, রায়পুরায় ৩৭ এবং বেলাব উপজেলায় ১৬ জন শহীদ হন। জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী শত শত নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে গণকবর দেয়।

রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর নরসিংদীতে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় প্রবল প্রতিরোধের মাধ্যমে। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণির মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নরসিংদী প্রথমে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিল। তখন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর শফিউল্লাহ। পরে ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে এলে দায়িত্ব নেন মো. নূরুজ্জামান।

দীর্ঘ নয় মাসে নরসিংদীর বাঘবাড়ী, পালবাড়ী, আলগী, পাঁচদোনা, পুটিয়া, চলনদীয়া, হাতিরদীয়া বাজার, শ্রীরামপুর বাজার, রামনগর, মেথিকান্দা, হাঁটুভাঙ্গা, ভাঙালীনগর, খানাবাড়ী, বেলাব বাজার, বড়িবাড়ী, নারায়ণপুর ও নীলকুঠিসহ বহু স্থানে যুদ্ধ হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো রয়েছে সেই সময়ের গণকবর ও বধ্যভূমি। নরসিংদীর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, শ্মশানঘাট, খাটেহারা সেতু, শীলমান্দি, মেথিকান্দা রেলস্টেশন, জিনারদী রেলস্টেশনসহ অন্তত ১৫টি স্থানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর বিদ্রোহী ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকজন সদস্য ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের নেতৃত্বে ৩১ মার্চ নরসিংদীতে পৌঁছান। ৮ এপ্রিল বাগবাড়ী কড়ইতলায় প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে ওঠে। ৯ এপ্রিল শুরু হয় প্রবল যুদ্ধ। ভারী অস্ত্রের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পালবাড়ীতে সরে গেলেও পাকিস্তানি বাহিনীও পিছু হটে। ১০ এপ্রিল পালবাড়ীতে অতর্কিত আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা থেমে যায়।

পরে পাকিস্তানি বাহিনী নরসিংদী শহর দখল করে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনে ঘাঁটি স্থাপন করে। এই প্রতিরোধে অংশ নেন নৌসেনা সিরাজ উদ্দিন আহমেদসহ ১২ জন যোদ্ধা। সীমিত অস্ত্র নিয়েও তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে বড় ক্ষতি করে। এই যুদ্ধের খবর প্রচারিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও আকাশবাণীতে।

এপ্রিলের শুরুতে বিমান হামলায় নরসিংদী শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং প্রচুর সাধারণ মানুষ নিহত হয়। পরে ধরে ধরে মানুষকে নিয়ে গিয়ে পাঁচদোনা মোড়ের কাছে হত্যা করে গণকবরে পুঁতে রাখা হয়। এসব ঘটনার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলা ও প্রতিরোধ চলতে থাকে।

ডিসেম্বরের শুরুতে জেলার অধিকাংশ এলাকা মুক্ত হয়। ১১ ডিসেম্বর শিবপুরের মজনু মৃধার নেতৃত্বে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ উড়িয়ে দেয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর জিনারদী এলাকায় শেষ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ২১ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ওই দিনই নরসিংদী সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।

নরসিংদী থেকে মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় খেতাব পান ছয়জন। তারা হলেন শহীদ মতিউর রহমান বীরশ্রেষ্ঠ, নেভাল সিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বীরপ্রতীক, আব্দুর রউফ বীর বিক্রম, খন্দকার মতিউর রহমান বীর বিক্রম, এ এস এম নুরুজ্জামান বীর বিক্রম এবং নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া বীর বিক্রম।

মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদীর অবদান তাই শুধু ইতিহাস নয়, এটি ত্যাগ ও সাহসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১২ ডিসেম্বর নরসিংদীবাসীর কাছে আজও একই সঙ্গে শোক ও গর্বের দিন।

আরও