নিম্ন
আয়ের মানুষের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি)। কার্ডধারী একজন
সুবিধাভোগী দুই কেজি মসুর ডাল, পাঁচ কেজি চাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি পেঁয়াজ ও এক কেজি
চিনি পাবেন। একজনের কার্ড দিয়ে অন্যজন পণ্য নিতে পারবেন না। কিন্তু লক্ষ্মীপুরে সে নিয়ম মানা
হচ্ছে না বলে অভিযোগ
তুলেছেন কার্ডধারী সুবিধাবঞ্চিতরা।
একজনের কার্ড দিয়ে অন্যজন পণ্য নিচ্ছেন। কেউ কেউ একাধিক কার্ডের মাধ্যমেও পণ্য কিনছে। এতে সরকারি এ সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা। এছাড়া টিসিবির দেয়া চাল নষ্ট ও পোকা আক্রান্ত বলেও অভিযোগ সুবিধাভোগীদের। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর ঈদগাহ মাঠে টিসিবি পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ছালেহা বেগম। তিনটি ফ্যামিলি কার্ড এনেছেন তিনি। যার একটিতেও নেই তার নিজের নাম। তিনটি কার্ডই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ছালেহা বেগম। সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হলেও তার হাতে থাকা কার্ড ১ নম্বর ওয়ার্ডের তোফাজ্জল হোসেন ভুলু, শহিদুল ইসলাম ও নুরুল ইসলামের। শুধু ছালেহা বেগমই নন, একাধিক ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে টিসিবির পণ্য নিতে এসেছেন সুজিয়া বেগম, আলমগীর ও সাহারা বেগমসহ অনেকে। তাদের একেকজনের হাতে দেখা মেলে দুই-পাঁচটি কার্ডের। সব কার্ডের বিপরীতেই পণ্য বরাদ্দ দিচ্ছে টিসিবি।
এসব ব্যক্তি জানায়, স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড। আবার কেউ জানান, তার মায়ের কার্ডটি করা হয়নি, স্ত্রীর জন্য কার্ড করা হয়েছে। এমন অনেকের হাতেই দেখা গেছে একাধিক কার্ড। অবশ্য এর পেছনে যুক্তিও দাঁড় করিয়েছেন তারা। একজন জানান, তার হাতে থাকা দুটি কার্ডের মধ্যে একটি তার ও আরেকটি তার ছেলের। আরেকজন জানান, তার হাতে থাকা কার্ডের বান্ডেলে একটি তার অন্যগুলো আত্মীয়স্বজনের। কোনোটিতেই নেই আত্মীয়স্বজনের নাম। আবার অনেকের কার্ডে নেই পূর্ণাঙ্গ তথ্য। কোনো কোনো কার্ডে দেখা গেছে আগের তথ্য মুছে বসানো হয়েছে নতুন তথ্য।
টুমচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাফিজ উল্যার স্ত্রী সুজিয়া বেগম টিসিবির পণ্য নিতে নিয়ে এসেছেন মুরাদ নামে এক ব্যক্তির কার্ড নিয়ে। সৈয়দ আহম্মদের কার্ড নিয়ে এসেছেন রুছিয়া বেগম। নার্গিস বেগমের কার্ড নিয়ে এসেছেন আলমগীর মিয়া এবং মিনোয়ারা ও কাহিনূর বেগমের কার্ড নিয়ে এসেছেন সাহারা খাতুন নামে এক নারী। তাদের কারো সঙ্গে কার্ডে উল্লিখিত ব্যক্তির কোনো সম্পর্ক নেই। কার্ডগুলো তারা ইউপি চেয়ারম্যানর কাছ থেকে পেয়েছেন বলে জানান।
কার্ডধারী সুবিধাবঞ্চিতরা অভিযোগ করেন, ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে একবার পণ্য কিনতে পারলেও, পরের মাসে কেনার সুযোগ নেই। কারণ ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও ডিলারের লোকজন যোগসাজশে তাদের কার্ডগুলো নিয়ে পছন্দের লোকদের দিয়ে দিচ্ছেন। তালিকায় নাম থাকার পরও তারা পরের মাসগুলোয় পণ্য কেনার সুযোগ পাচ্ছেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুবিধা নিচ্ছেন উচ্চবিত্ত ও সচ্ছলরা।
টিসিবির ডিলারের প্রতিনিধিরা জানান, শুরুতে ফ্যামিলি কার্ডগুলোয় ছবি থাকলেও পরে এগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়। এতে প্রকৃত ব্যক্তি যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের। তাদের নির্দেশেই পণ্য বিক্রির সময় কার্ডগুলো রেখে দেয়া হয়। পরে কার্ডগুলো ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়।
এদিকে টিসিবির পণ্য বিক্রি তদারকি কতে দেখা গেছে ট্যাগ অফিসার সদর উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা খাজা মাইন উদ্দিনকে। তার উপস্থিতিতে এমন অনিয়ম হচ্ছে তবু ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে টুমচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল আমিন লোলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ইউনিয়নে ১ হাজার ৬৯৬টি ফ্যামিলি কার্ড বরাদ্দ রয়েছে। টিসিবির ডিলার কেন পরিষদে কার্ডগুলো দিয়ে যায় তাদের প্রশ্ন করেন। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই। একজনের কার্ড দিয়ে অন্যজন কীভাবে পণ্য নেয়, সেটা মেম্বাররাই ভালো জানেন। টিসিবির ডিলার ও ইউপি মেম্বাররা তাদের পছন্দের লোকজনকে টিসিবির কার্ড দিচ্ছে। এ অনিয়ম রুখতে হলে সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
পরিবার কার্ডে অনিয়মের দায় ডিলারের প্রতিনিধির কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছেন টুমচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ওলি উল্যাহ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৪১টি ফ্যামিলি কার্ড বরাদ্দ আছে। এর মধ্যে আমার ওয়ার্ডে ১৯২টি। কিন্তু আমি পেয়েছি ১৪৬টি। পরে তদন্ত করে দেখেছি ডিলারের লোকজন চেয়ারম্যানের কাছে কার্ডগুলো পাঠানোর সময় ৩৬টি সরিয়ে রেখেছিল। পরে সেগুলো তাদের লোকদের দিয়েছে।’
অনিয়মের বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিসিবির পণ্য নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকার দিচ্ছে। সেখানে একজনের কার্ড দিয়ে অন্যজন পণ্য নেয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিগগিরই ফ্যামিলি কার্ড ডিজিটাল করা হবে, যাতে একে অন্যের কার্ডে এ সুবিধা নিতে না পারে।’