গাজীপুরে ৩৫ ভূমি অফিসে সহকারী কর্মকর্তা কেবল ১০ জন

সেবা পেতে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গাজীপুরে মোট ৩৫টি ভূমি অফিস রয়েছে। এসব অফিসে ভূমি সহকারী কর্মকর্তার অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০ জন।

‘একটি কাজের জন্য দুই বছর ধরে ঘুরছি। শুধু তারিখের পর তারিখ দিচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না’—অনেকটা রাগান্বিত কণ্ঠেই কথাগুলো বলছিলেন আবুল হোসেন। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তেলিপাড়া এলাকার বাসিন্দা। চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার বাসন ভূমি অফিসে এসেছিলেন জমির খারিজের কাজে। কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষায় থাকতে দেখে আলাপের একপর্যায়ে এসব কথা বলেন তিনি। আবুল হোসেন আরো বলেন, ‘শুনেছি এখানে লোকবল সংকট। তাই ঠিকমতো সেবা পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা তো হয়রানির শিকার হচ্ছি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। আমরা কেন সেবাবঞ্চিত হব? আমরা চাই, এখানে জনবল নিয়োগ দিয়ে যারা সেবাপ্রত্যাশী তাদের সঠিকভাবে সেবা দেয়া হোক।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বাসন নয়, গাজীপুরের সব ভূমি অফিসেই একই অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি অফিসগুলোতে প্রতিদিনই নামজারি, জমির খারিজ, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, খতিয়ানসহ নানা ধরনের সেবা নিতে আসেন জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ। এসব ভূমি অফিসে সেবা পেতে সেবাপ্রত্যাশীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। কাজ সম্পাদন করতে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন। জেলা প্রশাসন বলছে, গাজীপুরের ভূমি অফিসগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সেবা নিতে আসা মানুষের ওপর। জনবল সংকটের কারণে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে দেরি হয়।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গাজীপুরে মোট ৩৫টি ভূমি অফিস রয়েছে। এসব অফিসে ভূমি সহকারী কর্মকর্তার অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০ জন। বাকি ২৫টি অফিসে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে জেলার ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার ৬১টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৪৮ জন। এখানেও ১৩টি পদ শূন্য রয়েছে। ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তার মতো দুই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কর্মরত ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের একটি অংশ পদোন্নতি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাদের দাবি, বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতি না পাওয়ায় তারা মূল্যায়নবঞ্চিত হচ্ছেন।

কালিয়াকৈর উপজেলার সাকাশ্বর এলাকার ব্যবসায়ী এমারত হোসেন জানান, সফিপুর ভূমি অফিসে একজন পূর্ণাঙ্গ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। সেখানে সহকারী পর্যায়ের কর্মকর্তা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। তার মতে, প্রধান কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মকর্তার দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা থাকলে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হতো এবং সেবাপ্রার্থীরাও কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতেন।

সফিপুর ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার জানান, ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছর ধরে তিনি একই পদে কর্মরত। তার ভাষ্য, চাকরির বিধান অনুযায়ী সাত বছর পর পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা থাকলেও নিয়োগ বিধিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময়েও তা হয়নি। দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

সালনা ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ চান মিয়া জানান, অনেক কর্মকর্তা অবসরে গেছেন, অনেকে মারা গেছেন। ফলে বিভিন্ন পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। এদিকে অন্য জেলা থেকে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা গাজীপুরের শূন্য পদে যোগদান করায় স্থানীয়ভাবে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির গাজীপুর জেলা শাখার সভাপতি আলী হোসেন বলেন, ‘বিদ্যমান জনবল কাঠামো যখন তৈরি হয়েছিল, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। বর্তমানে জনসংখ্যা ও ভূমিসংক্রান্ত কাজ উভয়ই বেড়েছে। তবে সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি। ফলে স্বল্পসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সময়ে সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাজীপুর দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি জেলা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জমি কেনাবেচা, নামজারি, খারিজ, ভূমি উন্নয়ন করসহ ভূমিসংক্রান্ত সেবার চাহিদাও বাড়ছে। এ অবস্থায় জেলার ভূমি অফিসগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকা প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের ভূমি অফিসগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীর “প্রচণ্ড রকম” ঘাটতি রয়েছে। কোনো কোনো অফিসে ১০ জনের কাজ একজনকে করতে হচ্ছে। ফলে নাগরিকদের দৈনন্দিন যে সেবা দেয়ার কথা, তা কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘শূন্য পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সরকার অনুমতি দিলেই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কাজ করা কর্মকর্তাদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তাদের পদোন্নতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য পদে পদায়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।’ অচিরেই নিয়োগ ও পদায়নের মাধ্যমে ভূমি অফিসগুলোর জনবল সংকট কাটানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও