মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে হাজারো জনতা। অনুষ্ঠিত হয়েছে বিক্ষোভ মিছিল। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। সোমবারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও বন্ধ রয়েছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্স।
গতকাল বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনের রাজপথ ছিল বিক্ষোভকারীদের দখলে। সকাল থেকেই কারখানা শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরা রাজপথে মিছিল শুরু করে। তারা ‘সামরিক শাসন নিপাত যাক, গণতন্ত্রের জয় হোক’ স্লোগান দেয়। অং সান সু চিসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করে। শ্রমিক-শিক্ষার্থীদের মিছিল চলার সময় নগরীর বাস ও গাড়িচালকরা হর্ন বাজিয়ে সংহতি প্রকাশ করে।
গত সোমবারের অভ্যুত্থানের পর এটাই ছিল ইয়াঙ্গুনে অনুষ্ঠিত সামরিক শাসনবিরোধী সবচেয়ে বড় মিছিল। এ সময় অনেকেই লাল পোশাক পরে মিছিলে অংশ নেয়। এর মধ্য দিয়ে তারা সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রতি নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করে। সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি বিপুল জয় পেয়েছে। মিছিলে অনেককে এনএলডির পতাকা এবং সু চির ছবি বহন করতেও দেখা যায়।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা যাতে শহরের কেন্দ্রস্থলে মিছিল নিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য প্রধান সড়কগুলোয় প্রতিবন্ধকতা বসিয়ে দাঙ্গা পুলিশকে সতর্ক অবস্থান নিতে দেখা যায়। তবে কোনো সংঘাতের খবর মেলেনি। ইয়াঙ্গুনের পাশাপাশি এদিন রাজধানী নেপিদোতে সামরিক জান্তাবিরোধী মিছিল হয়েছে।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া একজন নারী বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা আজ রাজপথে নেমেছি। সামরিক শাসনের কড়াঘাত থেকে আমরা আগামী প্রজন্মকে মুক্ত রাখতে চাই।
মূলত অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষ যাতে রাজপথে নেমে বিক্ষোভে অংশ নিতে না পারে এবং বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য ইন্টারনেট সেবা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ রেখেছে জান্তা সরকার। মনিটরিং গ্রুপ নেটব্লকস ইন্টারনেট অবজারভেটরি জানিয়েছে, মিয়ানমারে ইন্টারনেট সেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে সাময়িক সময়ের জন্য নাকি দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে, সে বিষয়ে জান্তা সরকার কোনো তথ্য জানায়নি।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে মিয়ানমারে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়াকে ‘জঘন্য ও বেপরোয়া’ কর্মকাণ্ড উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস অফিস বলছে, সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও তথ্যে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট সেবা ও যোগাযোগ মাধ্যম অবিলম্বে চালু করতে হবে।
২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্ন উভয় কক্ষেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি। জনগণের এ রায় মেনে নেয়নি দেশটির সেনাবাহিনী তাতমাদো ও বর্মি রাজনীতিতে তাতমাদোর প্রক্সি হিসেবে পরিচিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে সংঘটিত হয় সেনা অভ্যুত্থান। মিয়ানমারে এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করে তাতমাদো। আটক করা হয় প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট ও অং সান সু চিকে। এ সময় দেশের ক্ষমতা কমান্ডার-ইন-চিফ মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এর পর থেকে উইন মিন্ট ও সু চির হদিস মেলেনি। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, সু চির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে পুলিশি হেফাজতে থাকতে হবে। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রয়োজনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নতুন করে অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছেন।