ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় থাকছে না সাবওয়ে, সমীক্ষার ৩২১ কোটি টাকা গচ্চা

বৃহত্তর ঢাকার আগামী ২০ বছরের হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) জায়গা পাচ্ছে না সাবওয়ে প্রকল্প। যদিও এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে ব্যয় হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা প্রণয়নকারী সংস্থা ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বলছে, প্রস্তাবিত সাবওয়ের কয়েকটি রুট বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন মেট্রোরেল রুটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় প্রকল্পটি ইউআরএসটিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, মেট্রোরেলের বর্তমান ও প্রস্তাবিত রুট বিবেচনায় নিয়েই সাবওয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রুটের কোথাও সাংঘর্ষিক বা অসামঞ্জস্য থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা সংশোধনেরও সুযোগ রয়েছে।

ঢাকা ও আশপাশ এলাকার পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৫-২০২৫ মেয়াদের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয় ২০০৫ সালে। পরে নগরায়ণ ও পরিবহন চাহিদা বাড়ায় এটি পর্যালোচনা করে ২০১৫-২০৩৫ মেয়াদের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২০৪৫ মেয়াদের জন্য হালনাগাদকৃত পরিকল্পনা ইউআরএসটিপি প্রণয়ন করে ডিটিসিএ। পরিকল্পনাটি এখন সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ডিটিসিএর কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী দুই দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভ্রমণের চাহিদা ও নগর সম্প্রসারণ বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়েছে। সে অনুযায়ী অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াতকে।

হালনাগাদকৃত পরিকল্পনায় আরএসটিপিতে থাকা ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের পাশাপাশি এমআরটি লাইন-৩ ও এমআরটি লাইন-৮ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কয়েকটি চলমান মেট্রোরেল প্রকল্প সম্প্রসারণের সুপারিশও রয়েছে। এছাড়া বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি), ডেডিকেটেড বাস লেন, সাইকেল লেন, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও দেয়া হয়েছে গুরুত্ব। তবে সাবওয়ে নির্মাণের বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ইউআরএসটিপি নিয়ে গত মাসে আয়োজিত এক সেমিনারে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ সাবওয়ে প্রকল্পটি পরিকল্পনায় যুক্ত করার আহ্বান জানান। জবাবে ‘মিড টার্ম রিভিউ অব দ্য রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এমটিআর-আরএসটিপি) ফর ঢাকা’ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম বলেন, মেট্রোরেলের রুটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সাবওয়ে পরিকল্পনায় রাখা হয়নি।

তবে এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় সেতু কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, সাবওয়ের রুট নির্ধারণের সময় মেট্রোরেলের বিদ্যমান ও প্রস্তাবিত রুট বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কোথাও রুটের সংঘর্ষ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন করা সম্ভব। তাদের মতে, রাজধানীর পরিবহন চাহিদা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। তাই দীর্ঘমেয়াদে সাবওয়ের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে প্রকল্পটি বাদ না দেয়াই উচিত।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাবওয়ে প্রকল্পটি ইউআরএসটিপিতে যুক্ত করার আশা আমরা এখনো ছাড়িনি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। বলা হচ্ছে, মেট্রোরেলের সঙ্গে সাবওয়ের রুট সাংঘর্ষিক। তবে আমাদের পরিকল্পনা মেট্রোরেলের রুট বিবেচনায় করেই করা হয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে তা সংশোধন করা হবে। ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় সাবওয়ের প্রয়োজন রয়েছে।’

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকায় ২৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ১১টি সাবওয়ে লাইন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০২ কিলোমিটার, ২০৪০ সালের মধ্যে আরো ৮৫ কিলোমিটার ও ২০৫০ সালের মধ্যে বাকি ৭১ কিলোমিটার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমীক্ষায় প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ২৭৯ কোটি মার্কিন ডলার। প্রস্তাবিত রুটগুলো রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সংযুক্ত করার লক্ষ্যেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।

সাবওয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশা প্রস্তুতের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ডিজাইন ফর কনস্ট্রাকশন অব ঢাকা সাবওয়ে’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এতে ব্যয় হয় ৩২১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। স্পেনের টিপসার নেতৃত্বে জাপানের প্যাডকো, বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস, কেএসসি ও বেটস যৌথভাবে সমীক্ষার কাজ সম্পন্ন করে। তবে সমীক্ষা শেষ হলেও প্রকল্পটি এখনো অনুমোদন পায়নি। নতুন পরিবহন পরিকল্পনায় সাবওয়ে না থাকায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আরও