ঈদযাত্রার বহরে প্রায় ২৯ হাজার মেয়াদোত্তীর্ণ বাস

দেশে নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা ৮৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার বাস ও মিনিবাসের বয়স ২০ বছর বা তারও বেশি বলে জানিয়েছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

পুরনো এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ এবারো ঈদযাত্রায় সড়কে চলাচল করছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার হয়ে যাওয়া এসব বাস-মিনিবাস ঈদে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ বিকল হয়ে যানজট ও বিশৃঙ্খলারও কারণ হতে পারে পুরনো বাসগুলো।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত একটি বাণিজ্যিক বাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১০-১৫ বছর। যদিও বাংলাদেশে একটি বাসের অর্থনৈতিক আয়ু নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ বছর, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি। আবার আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করে দিয়েও আয়ু ফুরিয়ে যাওয়া যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা সরকারের জন্য বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন তারা। শুধু ঈদ বা উৎসবের মৌসুম নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন সব ধরনের পরিবহন বন্ধে সারা বছরই সরকারের তৎপরতা থাকা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলায় ২০ বছরের পুরনো বাস ও মিনিবাস রয়েছে ১০ হাজার ৫৫৬টি। এর বাইরে সারা দেশে আরো ১৮ হাজার ২০৫টি বাস ও মিনিবাস রয়েছে, যেগুলোর বয়স ২০ বছর বা তার চেয়ে বেশি। অন্যদিকে সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যবাহী যানবাহন আছে ৪৬ হাজারের বেশি।

হাইওয়ে পুলিশ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়কে দুইভাবে সংকট তৈরি করে। প্রথমত, ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ায় যাত্রী ও চালক উভয়ই বিপাকে পড়েন এবং ওই গাড়িটি সড়কে আটকে থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, এসব গাড়ির ব্রেক, টায়ার, স্টিয়ারিং বা গিয়ারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দুর্বল থাকায় চালক সহজেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, যা ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার প্রায় ২০ শতাংশেরই মূল উৎস এ আনফিট মোটরযান, যা কেবল প্রাণহানিই ঘটায় না, বরং দুর্ঘটনার পর পুরো সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেয়।

যদিও পুরনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে পুলিশ-প্রশাসনের তৎপরতা শুধু ঈদকেন্দ্রিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রতি বছরই কেবল ঈদের সময়ই মানুষের স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে দেখা যায়। কিন্তু শুধু মৌসুমভিত্তিক এমন উদ্যোগ বাস্তবে ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে পারবে না। মানুষের যাতায়াত স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ করতে সরকারকে সারা বছরই কাজ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় বাড়তি চাহিদার কারণে পরিবহন সংকট থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সংকট প্রশমিত করার অনেক উপায় আছে। ঈদের সময় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের যে পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে, সেটা সরকার ঈদের সময় কাজে লাগাতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাসগুলো যেমন ভালো কন্ডিশনের থাকে, তেমনি এসব বাসের চালকরাও দক্ষ। এটা করা হলে পুরনো এবং ফিটনেসবিহীন বাসে ঈদের সময় মানুষের যাতায়াত অনেকটাই কমে আসবে।’ ঈদের সময় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর ব্যবহৃত পরিবহনগুলোকেও মানুষের যাতায়াতে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

একই ধরনের কথা বলেছেন সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি সড়কে চলবে, মানুষ মারা যাবে। প্রতি বছরই তাই হচ্ছে। কিন্তু এটা তো ঈদের আগে ১০-১৫ দিনের সময়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এটার জন্য সর্বনিম্ন তিন বছরের পরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে মাঠে নামতে হবে এবং তিন বছর পর একটা স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা হয়তো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘‌আমরা সুপারিশ করেছিলাম সরকারের পরিবহন পুলের যে ১ হাজার ২০০ গাড়ি আছে, সেনাবাহিনী, পুলিশের এবং সব সরকারি দপ্তর ও অধিদপ্তরের যে গাড়িগুলো আছে, বাস আছে সেগুলো যদি বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সরকার যাত্রী বহনে নিয়োজিত করতে পারত, তাহলে ঈদের সময় কিছুটা ঘাটতি পূরণ হতে পারে। কিন্তু সেটা তো সরকার করছে না। তাই মানুষকে বাধ্য হয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ, ভাঙাচোরা গাড়িতে যাতায়াত করতে হচ্ছে।’

প্রতি বছরের মতো এবারো ঈদ ঘিরে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের গ্যারেজগুলোতে ফিটনেসবিহীন ও অকেজো ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ বাস মেরামত ও রঙ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত না করে কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়ানো এসব পুরনো যান ঈদযাত্রায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে, যা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও মালিক পক্ষের সচেতনতা জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।

এদিকে ঈদের সময় ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় বাসের চলাচল ঠেকাতে অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সারওয়ার। গতকাল রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে বাস মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘লক্কড়-ঝক্কড় বাস রাস্তায় নামালেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঈদযাত্রা সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়-ঝক্কড় বাসের চলাচল ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ এ সময় দূরপাল্লার বাসে একাধিক চালক রাখা এবং বাসের ছাদে যাত্রী পরিবহন না করার আহ্বান জানান ডিএমপি কমিশনার।

আরও