নানামুখী সংকট দেখা দিয়েছে পঞ্চগড়ের চা শিল্পে। কাঁচা চা পাতার দরপতনের পর চাষীদের আন্দোলন এবং সর্বশেষ অনলাইন চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও কাটছে না সংকট। মূল্য নির্ধারণ কমিটির বেঁধে দেয়া প্রতি কেজি চা পাতা ১৮ টাকায় ক্রয় করতে বলা হলেও, তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। কারখানাগুলো দালাল নিযুক্ত করায় চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না চাষীরা। একের পর এক লোকসানে অনেকেই চা গাছ উপড়ে ফেলছেন। চা চাষীরা বলছেন, কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের কথা। অন্যদিকে কারখানা মালিকরা বলছেন, গুণগত মানের চা পাতা সরবরাহ না করায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
চা চাষীদের অভিযোগ, বর্তমানে ১০-১১ টাকায় কাঁচা চা পাতা বিক্রি করছেন তারা। এর মধ্যে চা সরবরাহ করলে নানা অজুহাতে ৩০-৪০ শতাংশ কর্তন করছেন কারখানা মালিকরা। ১০০ কেজি চা পাতা সরবরাহ করলে ৬০-৭০ কেজির মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে কারখানাগুলো ৩৫-৩৮ টাকা কেজিতে চা পাতা ক্রয় করেছিল। ২০০৫ সালে ৮ টাকা কেজিতে চা পাতা ক্রয় করা হয়েছিল। দেড় যুগ পর আবারো সেই ৭-৮ টাকা কেজিতে চা বিক্রি হচ্ছে। সংকট নিরসনের দাবিতে গত তিন বছরে তারা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছেন। সড়কে কাঁচা চা পাতা ফেলে, চা গাছ তুলে ফেলেও প্রতিবাদ জানান তারা। ন্যায্য মূল্য পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন। কিন্তু তাতেও সংকট কাটেনি। উল্টো বাগান থেকে চা পাতা সংগ্রহের জন্য শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে।
চা চাষী অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি সায়েদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত তিন বছর ধরে ক্ষুদ্র চা চাষীরা হতাশা ও সংকটে দিন পার করছেন। একদিকে কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেট, সেই সঙ্গে কারখানাগুলো দালাল নিযুক্ত করায় আমরা চা পাতার ন্যায্য মূল্য পাচ্ছি না। চা পাতা বিক্রি করে উৎপাদন খরচই হচ্ছে না। এখন চা পাতা সরবরাহের এক মাস পর মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে। অথচ শ্রমিকদের আমরা বকেয়া রাখছি না, তাৎক্ষণিক পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাকেও চা গাছ উপড়ে ফেলতে হবে।’
পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের চা বাগান মালিক রাজিউল ইসলাম রাজু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুই একর জমিতে চা বাগান করেছি। এক একর জমির চা গাছ কেটে আলু লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। চা পাতা এখন ১১ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তা আবার মূল্য পরিশোধ করছে এক মাস পর। এজন্য চা বাগান করে কোনো লাভ নেই। বাড়ির গরুছাগল বিক্রি করে বাগান করেছি, এখন প্রতি বছর লোকসান গুনছি।’
আঞ্চলিক চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চা নিলাম কেন্দ্রের জন্য পঞ্চগড়ে পাঁচটি ব্রোকার হাউজ ও দুটি ওয়্যারহাউজের অনুমোদন দেয়া হয়। অনলাইনে নিলাম কেন্দ্র উদ্বোধনের পর এ পর্যন্ত দুটি নিলাম সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম নিলামে ৪ অক্টোবর ২৫ জন বায়ারের অংশগ্রহণে ৯৭ হাজার ৬৮৫ কেজি চা বিক্রি হয়। ওইদিন সর্বোচ্চ ২১২ টাকায় এমএমটি এস্টেটের এক কেজি চা ও সর্বনিম্ন মলি টি ফ্যাক্টরির চা ১০২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। প্রথম নিলামে গড় বিক্রয় মূল্য ছিল ১১৯ টাকা। প্রথম নিলামে ১ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪১৫ টাকার চা বিক্রি হয়। দ্বিতীয় নিলাম ১৮ অক্টোবর সম্পন্ন হয়। ওইদিন ২ লাখ ৬১৫ কেজি চা নিলামে ওঠে। এর মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৪ কেজি চা গড় হিসাবে ১১৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। গত বছর জেলায় প্রায় ৭ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ৯৫০ কেজি কাঁচা পাতা কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে ১ কোটি ৫২ লাখ ২৯ হাজার ২৮৯ কেজি চা উৎপাদন হয়। এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ অঞ্চলে ১ কোটি ২৭ লাখ ৩ হাজার ৮৩ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে।
সিন্ডিকেটের বিষয়ে মরগেন টি ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নিয়াজ চিশতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিলামে দাম কম পাওয়ায় চাষীদেরও চা পাতার দাম কম দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে নিলামে প্রতি কেজি তৈরীকৃত চা ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আসলে যখন আমরা নিলাম বাজারে দাম কম পাই, তখন উপায় থাকে না।’
চা বোর্ডের ২০২২ সালের সূত্রমতে, জেলায় ১০ হাজার ২৩৯ একর জমিতে চা বাগান রয়েছে ৭ হাজার ৩৩৮টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত চা বাগান ১ হাজার ৩৬৮টি। চা চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার জনগোষ্ঠী। জেলায় বর্তমানে ২৬টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে। আরো ২১টি কারখানার অনুমোদন দেয়া আছে পঞ্চগড় জেলায়।
স্মল টি গার্ডেন ওনার্স টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক খোকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারখানার মালিকরা কালোবাজারে চা বিক্রি করছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। যে পরিমাণ চা নিলাম বাজারে পাঠায়, সে পরিমাণ চা কালোবাজারে বিক্রি করেন। মালিকরা চক্রান্ত করতে করতে তারাই এখন চক্রান্তের শিকার হয়েছে। দেশের বৃহত্তম ৫-৬টি চা কোম্পানি পঞ্চগড়ের চা বেশি দামে ক্রয় করছে না। কোম্পানিগুলো সবসময় পরিকল্পনা করছে, যাতে উত্তরাঞ্চলের চা কম দামে কেনা যায়।’
পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে পঞ্চগড়ের চা শিল্পে নানামুখী সংকট চলছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে একদিকে চাষীদের ভালো পাতা সরবরাহ করতে হবে। সেই সঙ্গে কারখানায় গুণগত মানের চা উৎপাদন করতে হবে।’
তিনি কারখানা মালিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘বড় বড় পাতা যাতে সরবরাহ করতে না পারে চাষীদের তা বাধ্য করতে হবে। বর্তমানে বেশির ভাগ চা কারখানায় টি মেকার নেই। কারখানায় টি মেকার না থাকায় গুণগত মানের চা উৎপাদন করতে পারছে না কারখানা কর্তৃপক্ষ। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কালোবাজারেও চা বিক্রি করছে কারখানা মালিকরা। উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ চা কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এসব সংকট উত্তরণে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে চা বোর্ড।’