বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের চুক্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাশ কাটিয়ে শুল্ক ও কর অব্যাহতির মাধ্যমে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ‘ফাঁকি’র অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ চুক্তির জন্য সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস (চুক্তির সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব ছিলেন) ও তার নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নথিপত্র তলব করা হয়েছে। দুদকের একটি চিঠি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অনুসন্ধান কর্মকর্তা উপপরিচালক রেজাউল করিম গত ১৬ এপ্রিল চিঠি পাঠিয়েছেন। চুক্তির আদ্যোপান্ত জানতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে ৪ ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এছাড়া এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি পাঠিয়ে তাদের প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দলিলও চেয়েছে দুদক। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আট সদস্যের তদন্ত দল গঠন করেছিল এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
আহমদ কায়কাউস ছাড়া আর কারো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে উপপরিচালক রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেকর্ডপত্র পাওয়ার পর বলা যাবে।’
ওই চিঠিতে বলা হয়, ড. আহমেদ কায়কাউস, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে এনবিআরকে পাশ কাটিয়ে আদানির সঙ্গে চুক্তি করে সরকারের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। উপর্যুক্ত অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রেকর্ডপত্র প্রয়োজন।
যেসব নথি চাওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তির শুরু হতে শেষ অবধি যাবতীয় রেকর্ডপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি, আদানি গ্রুপের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে কিনা— এ সংক্রান্ত রেকর্ড, বিদ্যুৎ ক্রয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের নাম, পদবি, বর্তমান ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর ও বর্ণিত বিষয়ে কোনো বিভাগীয় তদন্ত করা হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে তদন্ত প্রতিবেদনসহ বিস্তারিত তথ্য বা রেকর্ডপত্রাদি।
এর আগে অনুসন্ধানে নেমে আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের শুল্ক ‘ফাঁকির’ প্রমাণ পায় এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। বহুল আলোচিত এ চুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে শুল্ক ও কর অব্যাহতি দেয়ার তথ্যও উঠে এসেছে সংস্থাটির তদন্তে।
২০২৩ সালের ৯ মার্চ ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় স্থাপিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। তখন থেকেই আমদানি করা এ বিদ্যুতের শুল্কসহ অন্যান্য কর পরিশোধ করা হয়নি।
এনবিআরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দল তদন্তে নেমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ প্রবেশ ও সঞ্চালনের সময় আমদানির যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের অংশ হিসেবে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিলের প্রমাণ পায়নি। এছাড়া তা আইনি পন্থায় নিষ্পত্তি না করার প্রমাণও পায়। এর প্রেক্ষাপটে কর ‘ফাঁকির’ বিপুল এ অর্থ পিডিবির কাছ থেকে আদায়ের সুপারিশ করে এনবিআরের কমিটি।
আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার আলোচিত এ চুক্তিতে শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে সম্পাদন করা হয়েছে, তাতে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, শুল্ক পরিহার বা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে কিনা; এমন আরো কিছু প্রশ্ন সামনে রেখে তদন্তে নেমেছিল এনবিআরের আট কর্মকর্তার তদন্ত দল।
তাদের প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই পর্যন্ত ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিপরীতে ৩৯ কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৭ ডলারের শুল্ক-কর ‘ফাঁকি দেয়া হয়েছে’ বলে তথ্য উঠে আসে।
এনবিআরের দল তদন্তে দেখতে পেয়েছে, ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় আদানির কাছ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে শুল্ক ও অব্যাহতি দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে এনবিআরসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার গত ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ এর অধীন সম্পাদিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনায় একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করেছে।
ভারতের আদানি পাওয়ারসহ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত ১১টি চুক্তি খতিয়ে দেখবে বলে ৩ অক্টোবর জানায় এ কমিটি। এর মধ্যে আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন গড্ডা পাওয়ার প্লান্টও রয়েছে।