শেষ হলো প্রথম অধিবেশন

২৫ কার্যদিবসে পাস ৯৪ বিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। ২৫ কার্যদিবসের বৈঠকে মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে, গঠিত হয়েছে সাতটি কমিটি, আর রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রায় ৪০ ঘণ্টার আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ২৮০ জন সংসদ সদস্য।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গতকাল অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে এ তথ্য তুলে ধরেন। পরে রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে তিনি প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতির ১২ মার্চের ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাব কণ্ঠভোটে পাস হয়।

স্পিকার বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ। দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে’ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর এ অধিবেশন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা তিনি এ অধিবেশনে দেখেছেন, অতীতের কোনো সংসদে তেমন দৃশ্য দেখেননি। আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করি। মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিই।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই চেতনায় করব কাজ গড়ব দেশ’—এ প্রতিপাদ্য এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এ নীতি সামনে রেখে এগোতে হবে।’

সমাপনী ভাষণে স্পিকার বলেন, ‘এ অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ২৫ দিন। সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার তথ্য অনুযায়ী, এ অধিবেশনে মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। উত্থাপিত হয়েছে ১৩৩টি অধ্যাদেশ। একই সঙ্গে ২৮০ জন সংসদ সদস্য ৪০ ঘণ্টার মতো আলোচনায় অংশ নেন। স্পিকারের ভাষণেও বলা হয়, আইন প্রণয়ন কার্যাবলির পাশাপাশি গঠিত হয়েছে সাতটি কমিটি। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী কমিটি ও দুটি বিশেষ কমিটি রয়েছে। স্পিকার বলেন, সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল, যেখানে অংশগ্রহণকারী সদস্যরা সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এ সংসদে মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এতৎ সত্ত্বেও আপনাদের গঠনমূলক আলোচনা ও সহনশীল আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিস পাওয়া যায়, যার মধ্যে দুটি গৃহীত হয় এবং দুটি নিয়েই আলোচনা হয়। ৬৮ বিধিতে নয়টি নোটিস পাওয়া যায়; এর মধ্যে একটি গৃহীত হয় এবং সেটির ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। ৭১ বিধিতে মোট ১ হাজার ১৯৮টি নোটিসের মধ্যে ৪২টি গৃহীত হয় এবং ৩৮টির ওপর আলোচনা হয়। ৭১(ক) বিধিতে ২ মিনিট করে বক্তব্য দেয়া হয় ২০৭ বার। ১৬৪ বিধিতে ১৪টি নোটিসের মধ্যে একটি গৃহীত হয়ে বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। ২৬৬ বিধিতে একটি নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ কমিটি গঠিত হয়।’

স্পিকার বলেন, ‘এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরদানের জন্য মোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিস পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৩৫টির উত্তর তিনি সংসদে দিয়েছেন। আর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২ হাজার ৫০৯টি প্রশ্নের নোটিস পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর সংসদে দেয়া হয়েছে।’

এ সংবিধান আমাদের আবেগের সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আমাদের সম্মানিত এক সদস্য বলেছেন যে আমি সংবিধানকে ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করেছি এবং সংবিধান যেন ঠিক থাকে সেই ব্যাপারে আমি বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি, হ্যাঁ করেছি। কারণ এ সংবিধান আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত, এ সংবিধান আমাদের আবেগের সঙ্গে জড়িত, এ সংবিধান ১৯৭১ সালে লাখ লাখ শহীদের রক্তের সঙ্গে জড়িত।’

গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

বিএনপি চেহারা বদলায়নি, ‘তারা (জামায়াত) হঠাৎ করেই বদলে গেল উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দুর্ভাগ্য আমাদের যে ৫ আগস্টের পর উনারা বলছেন যে আমাদের চেহারা বদলে গেছে, আমাদের চেহারা বদলায়নি। তারা হঠাৎ করেই বদলে গেল, হঠাৎ করে মনে হলো যে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য একটা ইঙ্গিত পেয়ে গেছেন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সবকিছু তৈরি হয়ে গেছে। তখন তারা যেসব উক্তি এবং যেসব কথা বলেছেন বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে, এ বক্তব্যগুলো গণতন্ত্রকে সাহায্য করেনি। আজকে যে দূরত্ব, এ দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার একটা কারণ ছিল। আপনারা নির্বাচনকে অস্বীকার করছেন, নির্বাচনকে বলছেন যে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। এটা কেউই মেনে নেবে না। মেনে নেয়নি এ দেশের মানুষ, সেটা মেনে নেবে না।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কায় সবকিছুতে আপস করেছেন বলে জাতীয় সংসদে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলিনি। আমাদের একটা তাগাদা ছিল যে তারা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয় সেজন্য আমরা সবকিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। একত্রিত হয়েছি, সমঝোতা হয়েছে।’

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘যখন এই যে অবৈধ অসাংবিধানিক, সংবিধান-বহির্ভূত আদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করলেন আমরা স্টান্ডিং কমিটি গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছি, বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে অন্য যারা আছেন তারা আমরা কেউ জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কিছু মানতে রাজি নই। এটার রেকর্ড আছে। ভিডিও আছে। প্রেসে আছে। সব জায়গায় আছে।’

জামায়াতে ইসলামীর এ রকম কোনো ব্যাংক নেই বলে জাতীয় সংসদে বলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের । তিনি বলেন, আমাদের যারা এমপি আছে তাদের কেউ ইসলামী ব্যাংকে পরিচালক নয়। আমরা কোনো ঋণ পুনঃতফসিলও করিনি। ইসলামী ব্যাংক ছিল কতিপয় একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের উদ্যোগ। ব্যাংকটি খুব অল্প সময়ে পুরো এশিয়ার বেসরকারি খাতে এক নম্বর ব্যাংকের জায়গাটি দখল করে। যদি বলেন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।’

গতকাল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের সময়ে, তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা অবস্থা দেখেছি এবং এর একটা ভয়ংকর পরিণতি আমরা দেখি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক।’

রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেফতার করা প্রয়োজন দাবি করে নাহিদ ইসলাম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বক্তব্য আমি শুনিনি, এ নিয়ে কিছু বলার আগ্রহ আমার নেই। তবে রাষ্ট্রপতির কিছু কুকীর্তি এ হাউজের সামনে তুলে ধরতে চাই। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে দুদকের কমিশনার করা হয়েছিল তিনটি অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে; খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দুর্নীতির অভিযোগে শাস্তি নিশ্চিত করা, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্লিনচিট দেয়া, ফখরুদ্দিন- মইনউদ্দিনের আমলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হওয়া দুর্নীতির মামলা থেকে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের মুক্তি দেয়া। এমন একজন ব্যক্তিকে বিএনপি এখনো রাষ্ট্রপতি হিসেবে রেখেছে। এটি বিএনপির দেউলিয়াত্ব। আমাদের দুর্ভাগ্য এ দুর্নীতিবাজ, মিথ্যুক, অপদার্থ এখনো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আমরা এখনো দাবি জানাই, রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেফতার করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘৭২-এর সংবিধান রচনা করেছে, সত্তরে যারা নির্বাচিত হয়েছিল যাদের পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের কথা ছিল। এ সংবিধান ইনহেরেনটলি আনডেমোক্রেটিক সংবিধান। একজন ব্যক্তির হাতে সব ক্ষমতা দেয়ার সংবিধান। শেখ মুজিবকে সামনে রেখে এ সংবিধান করা হয়েছিল, এতে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, এমনকি বিচার বিভাগের ক্ষমতাও কায়দা করে তার হাতে দেয়া হয়েছে।’

বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় দেশের বিভিন্ন জেলার থানায় মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যা ৭৯৯ এবং অন্যান্য ধারার অধীনে ১ হাজার ৫৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।’

গতকাল জাতীয় সংসদে কুড়িগ্রাম-১ আসনের (জামায়াত) সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।

১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে বলে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৮টি এবং অন্যান্য মামলা ১১০টি। আর বাকি ১ হাজার ৬৯৭টি মামলার তদন্ত চলমান আছে। এ বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া হলেও দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্যে পুলিশ বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিটি মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে বিচারের সময় কোনো আইনি দুর্বলতা না থাকে।’

আরও