রাজবাড়ীতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ৫০টি ‘‌মডেল’ ঘর

১৫ হাজার মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ

পুরাতন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করায় প্রতি বছর দেশে উৎপাদনের প্রায় ৩০ ভাগ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়।

পুরাতন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করায় প্রতি বছর দেশে উৎপাদনের প্রায় ৩০ ভাগ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। এ কারণে পেঁয়াজের ঘাটতি মেটাতে করতে হয় আমদানি। পেঁয়াজের এই অস্থির বাজারে স্বস্তি দিতে ও পচন রোধে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজবাড়ীতে তৈরি করেছে ৫০টি ‘‌মডেল’ ঘর। যেখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৫ হাজার মণ পেঁয়াজ। এই পেঁয়াজই সারা দেশের ঘাটতি মেটাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর তথ্য মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় রাজবাড়ীর পাঁচটি উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে পেঁয়াজ চাষ হয়। রাজবাড়ীতে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয় তা সারা দেশের ১৪ ভাগ। আর অবস্থানগত দিক দিয়ে পেঁয়াজ চাষে রাজবাড়ী জেলা তৃতীয়। এ বছর রাজবাড়ীতে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে অন্তত ৪ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজবাড়ীর তথ্য মতে, পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণে কৃষক-কৃষাণীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজারভিত্তিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ পেঁয়াজ পচন রোধ হবে ও আমদানি বন্ধ হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দিতে ৩০টি ও কালুখালীতে ২০টিসহ মোট ৫০টি ‘‌মডেল’ ঘর তৈরি করেছে। একটি ঘরে সর্বনিম্ন ৩০০ মণ করে ৫০টি ঘরে অন্তত ১৫ হাজার মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা হয়েছে।

গতকাল সকালে সরজমিনে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের পেঁয়াজচাষী মো. লুৎফর রহমানের বাড়িতে বিনামূল্যে কংক্রিট, টিন ও বাঁশ দিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ উপযোগী একটি দৃষ্টিনন্দন ঘর তৈরি করে দিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সেই ঘরটিতে পাঁচটি স্তরে ৩০০ মণের অধিক পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছেন ওই চাষী। আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য দিনের বেলা দরজা খুলে রাখা হয়েছে।

এ সময় পেঁয়াজচাষী মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘‌এতদিন আমরা ঘরের মধ্যে মাচা তৈরি করে পেঁয়াজ রাখতাম। ওইভাবে পেঁয়াজ রেখে বেশির ভাগ নষ্ট হয়েছে। যে কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে। আর এই ঘরে পেঁয়াজ রেখে বছরের নয় মাস মজুদ করা যাবে। এখন আর পেঁয়াজ পচা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই।’

একই গ্রামের আরেক কৃষক মো. আরিফুর রহমান বলেন, ‘‌আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই পেঁয়াজচাষী। প্রতিটি বাড়িতে ৫০০-৭০০ মণ পেঁয়াজ মজুদ আছে। পেঁয়াজের তুলনায় ঘর সংখ্যা হয়েছে কম। এই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে একটি করে পেঁয়াজ রাখার ঘর প্রয়োজন।’

ইসলামপুর ইউনিয়নের করম চাঁদপুর গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলাম নুরু বলেন, ‘‌একমাত্র পচে যাওয়ার কারণে সরকারকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। পচন ঠেকানো গেলে আমদানিও হ্রাস সম্ভব। সরকার যেই ঘর তৈরি করে দিয়েছে উপকার তো হবেই, কৃষক লাভবানও হবেন। আগামীতে এই অঞ্চলে পেঁয়াজ ও রসুন চাষ আরো বাড়বে।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর রাজবাড়ীর মাঠ কর্মকর্তা মো. রাজিব খান বলেন, ‘বালিয়াকান্দি ও কালুখালীতে কৃষি বিপণন কেন্দ্রের ঘরগুলোর একেকটিতে পাঁচজন করে কৃষক অন্তত ৩০০ মণ করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন। প্রাকৃতিকভাবে টিন, বাঁশ, কাঠ ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি এ ঘর দুই বছর পর সামান্য মেরামত করে অন্তত ২০ বছর ব্যবহার করা যাবে। সরকারের দেয়া এ ঘরগুলোর দেখাশোনা করবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজবাড়ীর উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা রাজবাড়ীর চাষীদের সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল সংরক্ষণ করতে না পারা। এ কারণে চাষীরা লোকসান গুনত। বছরের শেষের দিকে ভালো দামটা পায়নি। এখন তারা সারা বছর পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবে।’

আরও