আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যদিও বিআইজিডির এক জরিপের তথ্যমতে, রাষ্ট্রের নেয়া সংস্কার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের পর নির্বাচন চায় দেশের ৫১ শতাংশ মানুষ। এছাড়া আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন—সে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি ৪৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এসব তথ্য উঠে এসেছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ভয়েস ফর রিফর্ম পরিচালিত ‘পালস সার্ভে ৩’ জরিপের ফলাফলে।
জরিপটি গত ১-২০ জুলাই পর্যন্ত গ্রাম ও শহরে চালানো হয়। এতে নানা শ্রেণী-পেশার ৫ হাজার ৪৮৯ জন মানুষ মতামত দেয়, তাদের ৫৩ শতাংশ পুরুষ ও নারী ৪৭ শতাংশ। এছাড়া জরিপে অংশ নিয়েছে ৭৩ শতাংশ গ্রামের ও ২৭ শতাংশ শহরের মানুষ। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, চলমান সমস্যা ও সংস্কারের বিষয়ে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এর আগে গত বছরের অক্টোবরের তথ্য নিয়ে ডিসেম্বর আরেকটি জরিপ প্রকাশ করে বিআইজিডি।
জরিপে দেখা যায়, সংস্কার করে তারপর নির্বাচন চায় ৫১ শতাংশ মানুষ। কিছু জরুরি সংস্কার করে নির্বাচন চায় ১৭ শতাংশ। সংস্কার ছাড়াই নির্বাচন চায় ১৪ শতাংশ মানুষ। এছাড়া ১৩ শতাংশ মানুষের দেশের সংস্কার নিয়ে ধারণা নেই।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে আপনি কাকে ভোট দেবেন’—এমন প্রশ্নের জবাবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ বলেছে বিএনপিকে ভোট দেবে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা কমে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ভোট দেয়ার কথা বলেছিল ১১ দশমিক ৩ শতাংশ, তা কমে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ১০ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দেয়ার কথা বলেছিল ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, তবে চলতি বছরের জুলাইয়ের জরিপে তা ৭ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এনসিপির প্রতি সমর্থন বেড়েছে। ২০২৪ সালে এনসিপির পক্ষে ভোট দেয়ার কথা বলেছিল ২ শতাংশ, চলতি বছরের জুলাইয়ে সেই সমর্থন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জরিপের ফলাফল অবাস্তব বলে মনে করছি। গ্রামগঞ্জে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে দেখেছি জনসমর্থন অনেক বেড়েছে। নতুন কমিটি, সমাবেশ ও কর্মসূচিগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বিএনপির প্রতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের আগ্রহ অনেক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জরিপটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা আনুষ্ঠানিক মতামত দেব।’
এ নিয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ জরিপে ৪৮ শতাংশ মানুষ কাকে ভোট দেবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি বলে উল্লেখ আছে। সংখ্যাগত দিক থেকে এটি রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক মোট ভোটের চেয়ে বেশি, যা মেজরিটির কাছাকাছি। এ অবস্থায় ভোটারদের আকৃষ্ট করার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আমরা এরই মধ্যে ২৪ দফা দিয়েছি। দফাগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমের ভিত্তিতে তরুণ ভোটারসহ অন্যরা এনসিপিকে বেছে নেবে বলে আশা করি।’
এবারের জরিপে ‘কখন নির্বাচন চান’—জানতে চাইলে ৩২ শতাংশ মানুষ আগামী ডিসেম্বরের আগে, ১২ শতাংশ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে, জুনের মধ্যে ১১ শতাংশ আর ২০২৬ সালের ডিসেম্বর অথবা তারপর নির্বাচনের হলে ভালো হয় বলেছে ২৫ শতাংশ মানুষ। অধিকাংশ মানুষ মনে করে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। ৭০ শতাংশ মানুষ এ ধারণা পোষণ করে। ১৫ শতাংশ মনে করে সুষ্ঠু হবে না আর ১৪ শতাংশ মানুষ জানে না বলে উত্তর দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইজিডির ফেলো সৈয়দা সেলিনা আজিজ। জরিপের ফল প্রকাশের পর অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিআইজিডির জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান। আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-আহ্বায়ক একেএম ফাহিম মাশরুর। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আলোচকরা।
মূল প্রবন্ধের সার্বিক বিশ্লেষণ ও মূল বার্তায় বিআইজিডির ফেলো সৈয়দা সেলিনা আজিজ বলেন, ‘বর্তমানে সমস্যার ধরন বহুমাত্রিক এবং এই সমস্যায় অর্থনীতির একতরফা প্রভাব কমেছে। এই বহুমাত্রিকতার কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা ও এগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অস্থিতিশীলতা। এই কারণগুলোর জন্যই অন্তর্বর্তী সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। মানুষ এই অস্থিতিশীলতার সমাধান খুঁজছে দুইভাবে; এক. নির্বাচন, দুই. সংস্কার। যদিও মানুষ নির্বাচনমুখী, তবু আমাদের ফলাফল অনুযায়ী একটি বিশাল গোষ্ঠী এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ভোটের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রার্থী মনোনয়ন বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।’