অপারেশন সার্চলাইটের পর পুরো পরিস্থিতিকে বিদ্রোহ কিংবা অভ্যুত্থান যেটাই বলা হোক না কেন—এ পর্যায়ে হাফিজ আর শব্দের সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে ভাবেননি; তার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট—তিনি যুদ্ধে নেমেছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি যশোর সীমান্তের ওপারে একটি পরিত্যক্ত খামারবাড়িকে অস্থায়ী ব্যারাকে রূপান্তর করেন।
সেখানে জানালা দিয়ে তরুণদের বাঁশের লাঠিতে প্রশিক্ষণের শব্দ ভেসে আসছিল। হাফিজ তখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক মেজরের সঙ্গে গোপনে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদের তালিকা যাচাই করছিলেন। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে দুই শতাধিক বাঙালি সৈন্য নিয়ে আসা হাফিজ শুরুতে নিজেকে একা মনে করলেও সেখানে পৌঁছে বুঝতে পারেন লড়াইটা পুরো জাতির। ঢাকার রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং তাদের পাঠানো সেই শেষ রেডিও বার্তা সারা দেশের বাঙালি সামরিক ও আধা-সামরিক ইউনিটগুলোকে সংগঠিত হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। মেজর জিয়াউর রহমান রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে নতুন ব্যাটালিয়ন তৈরি করেন, যার নাম হলো জেড-ফোর্স।
যশোর থেকে পালিয়ে আসা সৈনিকদের মুখে হাফিজ শুনতে পান পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার খবর। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই অসংখ্য বাঙালি সিপাহিকে হত্যা করা হয়েছে এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল জলিলের মতো কর্মকর্তারা কী অবস্থায় রয়েছেন তাও জানা যাচ্ছে না। শুরুতে হাফিজের ইউনিটটি ছোট ও সরঞ্জামহীন হওয়ায় তারা ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি বেনাপোলের মতো স্থানে ছোটখাটো সংঘর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তবে ধীরে ধীরে প্রতিরোধ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। হাফিজ যখন সীমান্ত অতিক্রম করে সাহায্যের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হয়েছিল। কারণ প্রশিক্ষণের সময় তিনি ভারতীয় সৈন্যদের শত্রু হিসেবে বিবেচনারই শিক্ষা পেয়েছিলেন। ভারতের তুরা শহরের প্রশিক্ষণ শিবিরে গিয়ে হাফিজ যুদ্ধের এক অন্য রূপ দেখেন। সেখানে হাজার হাজার শরণার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক জড়ো হয়েছিল, যাদের প্রত্যেকের পেছনে ছিল স্বজন হারানো বা নির্যাতনের বীভৎস গল্প।
সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকায় হাফিজ ও ভারতীয় মেজর মিলে সিদ্ধান্ত নেন যে সবাইকে রাইফেল চালানো শেখানো সম্ভব না হলেও গ্রেনেড ছোড়া দ্রুত শেখানো সম্ভব। এ সাধারণ মানুষদের নিয়েই হাফিজ বাহিনী গড়ে তুলতে শুরু করেন। বৃষ্টির মধ্যেই তুরায় সোভিয়েত নির্মিত ভারী কামানের সারি আর ভারতীয় কারখানার ছোট অস্ত্রশস্ত্রের উপস্থিতি হাফিজকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে এ যুদ্ধে বিশ্বশক্তির নজর নিবদ্ধ হয়েছে। হাফিজ নিষ্ঠার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবকদের বাছাই করতেন এবং তাদের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হতো, যা ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের ভিত্তি তৈরি করছিল।
হাফিজ তার কমান্ডিং অফিসার মেজর জিয়াউর রহমানকে পছন্দ করতেন। জিয়া ছিলেন ক্যারিশম্যাটিক এবং অসম্ভব সাহসী। হাফিজ তাকে দেখতেন সৈনিকদের সৈনিক হিসেবে। জিয়ার সততা ও দেশপ্রেম তাকে মুগ্ধ করেছিল, তিনি তার আদর্শের জন্য যেকোনো কিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। হাফিজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন জিয়াউর রহমান তাকে যে নির্দেশই দেবেন তিনি তা পালন করবেন, এমনকি তা করতে গিয়ে মৃত্যু হলেও পিছপা হবেন না।
অন্যদিকে, হাফিজের কাছ থেকে শত মাইল দূরে, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাংশে হাই ও মালিকের মতো একদল যুবক চরম ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে ত্রিপুরার বক্সানগরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত মনপুরা থেকে বেঁচে ফেরা এ যুবকরা তাদের জমানো অর্থ দিয়ে অস্ত্র কিনে যুদ্ধে নামার সংকল্প করেছিল। পথে পথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নজরদারি এবং বৃষ্টির কারণে তাদের যাত্রাপথ হয়ে উঠেছিল যন্ত্রণাদায়ক। শরণার্থী মিছিলে জোয়ান ছেলেদের ওপর সেনাদের কড়া নজর থাকায় তারা মূল পথ ছেড়ে দুর্গম জঙ্গল ও বিল পাড়ি দিচ্ছিল। প্রতি মুহূর্তে রাজাকারদের ভয় থাকলেও হাই তার অভিজ্ঞতায় বুঝেছিল যে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরাই তাদের সবচেয়ে নিরাপদ পথপ্রদর্শক হতে পারেন। পথে পরিচয় গোপন রাখতে"‘মায়ের কাছে ফিরছি’”নামক একটি সাংকেতিক বাক্যের ব্যবহার তাদের একবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়।
সীমান্ত পার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে হাই ও মালিকের মধ্যে পথ চলা নিয়ে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়। মালিক ধৈর্য হারিয়ে একা অন্ধকার পথে পা বাড়ায়, আর হাই স্থানীয় এক নারীর আশ্রয়ে থেকে ভোরের অপেক্ষায় থাকে। ভোরবেলা লতিফকে সঙ্গে নিয়ে হাই যখন এক রিকশাচালকের সাহায্যে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিল, তখনই ঘটে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। রিকশাচালক পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তাদের খবর দিয়ে দেয়। টাকার লোভে সে লতিফকে জাপটে ধরলে হাই কোনোমতে প্রাণ বাঁচাতে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়। কিন্তু এ পলায়ন তাকে শূন্যতার মুখোমুখি করে। সঙ্গীহীন, অর্থহীন এবং লক্ষ্যচ্যুত হাই একপর্যায়ে নিজেকে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে। কিন্তু পেছনে ধেয়ে আসা পাকিস্তানি সেনাদের বুটের শব্দ তাকে আবারো বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। পলায়ন নয়, বরং টিকে থাকার তাগিদে এবং নিজের অপমানের প্রতিশোধ নিতে হাই আবারো অন্ধকারের মধ্যে দৌড়াতে শুরু করে—অনিশ্চিত কিন্তু নতুন কোনো প্রতিরোধের সন্ধানে।
হাফিজের মতো প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা আর হাইয়ের মতো সর্বস্ব হারানো সাধারণ যুবক—উভয়ের গন্তব্যই ছিল এক ও অভিন্ন। একজন সংগঠিত রণক্ষেত্রে আধুনিক মারণাস্ত্র হাতে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, অন্যজন স্বজন আর সম্পদ হারিয়ে কেবল অদম্য প্রাণশক্তি নিয়ে শত্রুবেষ্টিত জনপদ পাড়ি দিচ্ছিলেন।