যশোরে গত এক বছরে ৬২ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৬০ জন ও চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আরো ২ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। প্রকাশ্যে দিবালোকেও ঘটছে খুনের ঘটনা। এছাড়া বেড়েছে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও। অপরাধ কর্মকাণ্ডে বেড়েছে পিস্তল, চাকু, ছুরি ও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন শহরের বাসিন্দারা। নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ বলছে, অন্যান্য সময়ের চেয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড কিছুটা বাড়লেও সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। অপরাধ ও খুনোখুনিতে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করা হচ্ছে। হত্যার রহস্য উন্মোচন এবং প্রায় সব খুনের ঘটনায় জড়িতদের কম-বেশি গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, যশোরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ৬২টি। পারিবারিক বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও পরকীয়ার জেরে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে অধিকাংশ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চারটি, ফেব্রুয়ারিতে তিন, মার্চে ছয়টি, এপ্রিলে ছয়, মে মাসে সাত, জুনে আট, জুলাইয়ে ছয়, আগস্টে ছয়, সেপ্টেম্বরে দুটি, অক্টোবরে সাত, নভেম্বরে তিন, ডিসেম্বরে দুটি ও চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২২ মে অভয়নগর উপজেলার ডহর মশিয়াহাটী গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন নওয়াপাড়া পৌর কৃষক দলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম। এ হত্যার পর ওই এলাকায় মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ২০ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়, যা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ঘটনাটির মূল কারণ মাছের ঘের নিয়ে বিরোধ হলেও তদন্তে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে।
গত ৯ জুন সদর উপজেলার ডাকাতিয়া গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মইন উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই রাতে চৌগাছার পুড়াহুদা গ্রামে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই রবিউল ইসলাম নিহত হন। ১৪ জুন অভয়নগরের নাউলি গ্রামে কুয়েত প্রবাসী হাসান শেখকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। নিহতের ভাই মুন্না জানান, পূর্বশত্রুতার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড। আর একই রাতে শার্শার দুর্গাপুর বাজারে রাজনৈতিক বিরোধে নিহত হন বিএনপি কর্মী লিটন হোসেন।
গত ৯ জুলাই বাঘারপাড়ার ঘোষনগর গ্রামে সুচিত্রা সেন দেবনাথ নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার হয় লেপ-তোশকের স্টিলের বাক্স থেকে। এ ঘটনায় তার তপন দেবনাথকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১২ জুলাই রাতে যশোর শহরের ষষ্ঠতলা এলাকায় আশরাফুল ইসলাম বিপ্লব নামের এক যুবক খুন হন।
৬ ডিসেম্বর যশোরে গভীর রাতে তানভীর হোসেন নামে এক যুবক খুন হন। নিহতের প্যান্টের পকেট থেকে ৬১ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। ১৩ ডিসেম্বর যশোর সদরে প্রকাশ্যে শহীদ নামের এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় বিএনপির এক নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৫ জানুয়ারি মনিরামপুরে এক বরফকল ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। ওইদিন সন্ধ্যায় উপজেলার কপালিয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী (৩৮) কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। জেলার অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার সাবেক শ্রমিক নেতা ওলিয়ার রহমান হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত আসামি তিনি।
পুলিশ বলছে, রানার বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি হত্যা, ধর্ষণ ও কেশবপুর থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের তিনটি মামলা রয়েছে। ২০১৪ সালে অভয়নগর থানায় শ্রমিক নেতা ওলিয়ার হত্যা মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। ২০২০ সালে এ একই থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়।
এদিকে এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে। সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শাহিন ইকবাল বলেন, ‘দিনদুপুরে ঘটছে খুনের ঘটনা। এছাড়া চুরি-ছিনতাই হচ্ছে অহরহ। এ নিয়ে জেলার বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে আছে।’
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান বলেন, ‘যশোরে এক বছর ধরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। হত্যার ঘটনা বাড়ছে। একই সঙ্গে ছিনতাই ও চুরি হচ্ছে।’
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার বলেন, ‘৬২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অধিকাংশ ঘটনার মোটিভ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি যারা এখনো গ্রেফতার হয়নি, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সবশেষ বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যার রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। জামাতার পরিকল্পনা ও তার দেয়া অস্ত্রেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। হত্যায় জড়িত শুটার ত্রিদিব চক্রবর্তী মিশুকের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রানা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে।’