দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি রয়েছে। প্রায় ৪৬ হাজার বন্দি ধারণের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে বন্দির সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ হাজারই বিচারাধীন, যা মোট বন্দির প্রায় ৬৭ শতাংশ। ফলে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দির চাপে আবাসন, খাবার, চিকিৎসা, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সংকট তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে সংক্রামকসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। বর্তমানে সেখানে বন্দি রয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। এর মধ্যে বিচারাধীন ৬৮ হাজার ৩৩০ জন এবং কয়েদি বন্দি ৩৩ হাজার ৬৮৭ জন। বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ৬১ হাজার ৩৬৭, ২০২৩ সালে ৫৭ হাজার ৭০০, ২০২৪ সালে ৫৫ হাজার ও ২০২৫ সালে ৫৯ হাজার।
কারা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগার মূলত সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের শাস্তি কার্যকরের জায়গা। কিন্তু সেখানে যদি বিপুলসংখ্যক বিচারাধীন মানুষ দীর্ঘ সময় আটকে থাকেন, তাহলে পুরো কারা ব্যবস্থার ওপরই অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। এ সংকটকে শুধু কারা অধিদপ্তরের সমস্যা হিসেবে না দেখে তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার ব্যবস্থার সমন্বিত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত বন্দির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে চিকিৎসাসেবায়। বন্দির সংখ্যার তুলনায় চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও হাসপাতাল শয্যার ব্যবস্থা অপ্রতুল।
কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কারা হেফাজতে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ায় বন্দিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে বয়স্ক, অসুস্থ ও দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা বন্দিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকায় কারাগারগুলোয় মানবাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করেন গুম তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বন্দিদের দেখভালের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের। আইন অনুযায়ী একজন বন্দির বাসস্থান থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের। কিন্তু যখনই কারাগারগুলোয় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বন্দি থাকে, স্বাভাবিকভাবে তখন বন্দিরা প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পান না। এটা মানবাধিকার হরণ। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সব বন্দির জন্যই প্রাপ্য সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করা, জামিনযোগ্য ও কম গুরুতর মামলায় বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা এবং অপ্রয়োজনীয় আটক কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব বন্দির বিরুদ্ধে মামলা দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন, সেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে কারাগারে বন্দি মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনা জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারাবাসের ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম অধিকার রয়েছে, তা অতিরিক্ত বন্দির জন্য উপেক্ষিত হচ্ছে। দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তসহ বিচারিক কাজগুলো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যে ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়, সেই ধাপগুলো বিলম্বিত হচ্ছে। এর প্রভাব কারাগারগুলোয় পড়ছে।’
ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকায় কারাগারে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন কারা উপমহাপরিদর্শক (স্বাস্থ্য) লে. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হাসিব দেওয়ান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশেষ করে স্বল্প জায়গায় বেশি সংখ্যক বন্দি অবস্থান করায় তাদের মধ্যে যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, কলেরা ও হামের মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে চর্মরোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি থাকলে সবার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন।’