রংপুরের মেরাজুল ইসলামের (৩৫) বিবাহবার্ষিকী ছিল ১৯ জুলাই। তাই দিনটিকে ঘিরে আগে থেকেই বাড়িতে চলছিল রান্নার প্রস্তুতি। তবে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কেনা বাকি ছিল। সেগুলো আনতে গিয়েছিলেন রংপুর শহরে। কোটা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশের মতো ১৯ জুলাই উত্তাল ছিল রংপুরও। সিটি বাজারের পাশেই চলছিল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল। কিছুক্ষণ পরই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুরু হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছোড়া হয় গুলি। সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মেরাজুল।
মহাজনের কাছ থেকে কলা কিনে সিটি বাজারের সামনে বিক্রি করতেন নগরীর জুম্মাপাড়ার মেরাজুল। যা আয় করতেন তা দিয়েই চলত তাদের সংসার। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে বাড়ির সবাই শোকে কাতর। মেরাজুলের তিন বছরের ছেলে মো. হানিফা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি চিরতরে সে বাবার স্নেহ হারিয়েছে। আরেক ছেলে নাজির হোসেন নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
মেরাজুলের স্ত্রী নাজমীম ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘১৯ জুলাই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশের খবর আমার স্বামী এমনকি আমরাও জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে তাকে যেতে বারণ করতাম। বিকাল ৫টার পর জানতে পেরেছি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্রে করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে যখন মেরাজুলকে দেখেছিলাম, তখনো সে জীবিত ছিল। চিকিৎসকরা অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আনতে বলেছিলেন। ননদ রাবেয়াকে সঙ্গে করে ৬ হাজার টাকার ওষুধ কিনে আনার পর জানানো হয় মেরাজুল মারা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘দুই সন্তান ও শাশুড়িসহ পাঁচজনের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন মেরাজুল। বড় ছেলের লেখাপড়া খরচসহ সংসার কীভাবে চলবে তা ভেবে পাচ্ছি না। এখনো সরকারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের খোঁজখবর নেয়নি। স্বামী হত্যার প্রতিবাদে ওইদিন থেকে আমি এক কাপড়েই দিনযাপন করছি।’
মেরাজুলের মা আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে মেরাজুল তৃতীয়। মেরাজুলরা ছোট থাকতে আমার স্বামী সামসুল হক মারা যান। অনেক কষ্ট করে পরিবারটির দেখভাল করেছি। যখন মেরাজুল বড় হয়ে সংসারের হাল ধরে তখন অনেকটা নিশ্চিন্ত ছিলাম। সে মহাজনের কাছ থেকে কলা কিনে সিটি বাজারের সামনে বিক্রি করত। কলা বিক্রি করে যা আয় হতো তা দিয়ে চলত সংসার। কিন্তু নিরপরাধ ছেলের জীবন এভাবে চলে যাবে তা কখনো কল্পনা করিনি।’ যাদের গুলিতে মেরাজুল প্রাণ হারিয়েছে তাদের বিচার দাবি করেন আম্বিয়া খাতুন।