খুলনা নগরীতে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) অধিকাংশ নালা-নর্দমা ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ঘরোয়াভাবে মশা তাড়ানোর কোনো ফর্মুলাই কাজে আসছে না। দিনে দিনে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে নগরবাসীর। তবে মশা নিধন কার্যক্রম চলমান বলে দাবি কেসিসির।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘সঠিক সময়ে মশার প্রজনন রোধ করতে না পারায় নগরীতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। মশার যন্ত্রণায় নগরবাসী অতিষ্ঠ। বাসাবাড়ি-কর্মস্থান কোথাও নিস্তার মিলছে না। প্রতি বছরই এ সময় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা সময়মতো ব্যবস্থা নিলে নগরবাসীকে মশার এমন উপদ্রব সইতে হয় না।’
পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে নগরীতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাবে নগরীর বিভিন্ন স্থানের নালা-নর্দমা-খালে পানি জমে থাকছে, ঝোপ-ঝাড়ও সঠিকভাবে পরিষ্কার হচ্ছে না। তাছাড়া ভাগাড়, পলিথিন, কর্কশিট, রাস্তার পাশের টায়ারের দোকান, দীর্ঘদিন ফেলে রাখা মোটরযান, ঢালাইমেশিন মশা জন্মানোর উপযুক্ত স্থান। বিভিন্ন মার্কেটের পরিত্যক্ত ছাদ, দুই বাড়ির মাঝে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ও ভবনের ট্যাংকির পানি জমেও সেখানে মশা জন্মে।
মুকুল বলেন, ‘দ্রুত নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের নালা-নর্দমা-খাল পরিষ্কার এবং ওষুধ ছিটিয়ে মশার প্রজনন স্থান ধ্বংস করা উচিত।’
কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ বলেন, ‘নগরীতে সেফটি ট্যাংকের আউট-লেট উন্মুক্ত রাখা, নালা-নর্দমা-খালে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, ঝোপঝাড় ও ফুলের বাগান পরিষ্কার না করার কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। মশার বংশবিস্তার রোধে নগরীতে “ক্রাশ’’ কার্যক্রমের পাশাপাশি “নিধন’’ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে এ কাজে আমাদের আরো জনবল প্রয়োজন। তাছাড়া আধুনিক বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণকাজ শেষ হলে নগরের বর্জ্য দ্রুত অপসারণ হবে। এতে মশার উপদ্রব কমে আসবে।’
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মসূচির ফল খুবই সামান্য। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই নগরীতে মশার প্রকোপ বেড়েছে। আগে শুধু রাতেই মশার উৎপাত ছিল। এখন দিনের বেলায়ও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ জনজীবন। কয়েল, স্প্রে, ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহারসহ ভুক্তভোগীরা ঘরোয়াভাবে মশা তাড়ানোর নানা পদ্ধতি প্রয়োগের চেষ্টা চালালেও তা কোনো কাজেই আসছে না।
নগরীর বয়রা এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, গত ছয় মাসের মধ্যে একদিনও সিটি করপোরেশনের কাউকে মশা মারতে দেখেনি। ফগার মেশিনের আওয়াজও শুনিনি। সিটি করপোরেশন কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়াতেই মশার এমন প্রকোপ বেড়েছে।
নগরীর ময়লাপোতা এলাকার বাসিন্দা তানভীর আহমেদ বলেন, ‘নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে দীর্ঘদিন থেকে। এতে বাসাবাড়ির পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ নেই। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলমান এ কাজের জন্য ড্রেনগুলোয় পানি চলাচল একেবারেই বন্ধ। অনেক এলাকায় ড্রেনের পানি চলে এসেছে সড়কের ওপর। দীর্ঘদিন জমে থাকা এসব নোংরা পানি মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া নগরীর ডাস্টবিন ও আবর্জনা ফেলার স্থানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।
নগরীর খালিশপুর নয়াবাটি এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছর শীত মৌসুমের শেষের দিকে নগরীতে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। গত প্রায় সপ্তাহদুই ব্যাপকভাবে মশার প্রকোপ বেড়েছে। মশার কারণে ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারছে না। কয়েল, স্প্রে, ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশার উৎপাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া কয়েল জ্বালালে সেই ধোঁয়ায় নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘মশার উপদ্রব এত বেশি যে, দরজা-জানালা খুলে রাখার উপায় নেই। দিনের বেলায়ও ঘরে মশারি টানিয়ে রাখতে হচ্ছে। এমনকি বাস, ট্রেন, চলতি যানবাহনেও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নাগরিকরা।
খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘ঋতু পরিবর্তনের সময় স্বাভাবিকভাবে মশার উপদ্রব বাড়ে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে উল্লেখ করে সিটি মেয়র বলেন, ‘বাড়ির আশপাশ এবং নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখতে হবে। নালা-নর্দমায় আবর্জনা পড়তে দেয়া যাবে না। আবর্জনা পড়ে পানি সরবরাহ বন্ধ হলে সেখানে মশার লার্ভা সৃষ্টি হয়। আর সেখান থেকেই মশার উৎপত্তি হয়।’