মিরপুরের প্যারিস রোড

ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণসামগ্রীতে দখল একমাত্র মাঠ

মাঠসংলগ্ন সড়কের পাশে সারি সারি রিকশা-ভ্যান পার্ক করে রাখা হয়েছে। সেগুলোর আশপাশেও জমেছে ময়লা।

ঘনবসতিপূর্ণ মিরপুরে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠের তীব্র সংকট। অথচ প্যারিস রোড এলাকায় যে মাঠটি রয়েছে তাতে ছড়িয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, স্তূপ করে রাখা হয়েছে সড়ক উন্নয়নকাজের নির্মাণসামগ্রী। ভেঙে পড়ে আছে গোলপোস্ট, জরাজীর্ণ বেড়ার অধিকাংশই খুলে নিয়ে গেছে যে যার মতো। ফলে মাঠটিতে নেই শিশুদের নিরাপদে খেলাধুলার পরিবেশ। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সন্তানদের মাঠে নিয়ে আসতে সাহস পান না অনেক অভিভাবক।

সরজমিনে গতকাল দেখা যায়, আশপাশে বহুতল আবাসিক ভবন, দোকানপাট ও স্কুল। প্যারিস রোড মাঠের ভেতরে ও চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পলিথিন, প্লাস্টিকের মোড়ক, খাবারের প্যাকেট, পুরনো কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। এক প্রান্তে কংক্রিটের খুঁটি ও একটি গাছের গোড়ায়ও জমেছে আবর্জনার বড় স্তূপ। মাঠসংলগ্ন সড়ক ও ফুটপাতের পাশেও পড়ে আছে ময়লা। এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে মাঠের পরিবেশ। এরই মধ্যে মাঠের খোলা অংশে ফুটবল খেলছিল স্থানীয় কয়েক কিশোর।

মাঠের চারপাশে চলমান সড়ক উন্নয়নকাজ পরিস্থিতিকে যেন আরো জটিল করে তুলেছে। ফুটপাত নির্মাণের জন্য আনা টালি ও কংক্রিটের ব্লক, বাঁশ, ভাঙা কংক্রিটের স্ল্যাবসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী স্তূপ করে রাখা হয়েছে মাঠের একাংশে। কিছু ব্লক পড়ে আছে ঘাসের ওপর। কোথাও বালির স্তূপ, কোথাও রড ও লোহার জাল রাখা হয়েছে অস্থায়ী কাঠামোর পাশে। মাঠের এক কোণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সড়ক উন্নয়নকাজ তদারকির জন্য তৈরি করা হয়েছে টিনের অস্থায়ী শেড। এর পাশেও জমে আছে আবর্জনা।

মাঠের এমন পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার সন্তানের বয়স পাঁচ বছর। সারাক্ষণ খেলার জন্য ছটফট করে। বাসার বাইরে আনতে পারি না। এলাকায় কেবল একটি মাঠ, সেটিও সারা বছর খেলার অনুপযোগী থাকে। মাঠের চারপাশে নির্মাণসামগ্রী, ছোট ইটের টুকরোসহ বিভিন্ন জিনিস পড়ে থাকে, যেগুলো থেকে শিশুদের আহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও সন্তানকে মাঠে নিয়ে আসি না।’

আরেক বাসিন্দা মুবিন ইসলামও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘মাঠটি দীর্ঘদিন ধরেই খেলার অনুপযোগী। তাই খেলতে চাইলেও চারপাশে নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় সন্তানকে মাঠে আনি না।’

শুধু আবর্জনা ও নির্মাণসামগ্রী নয়, মাঠের খেলার সরঞ্জামও বেহাল। মাঝখানে থাকা একটি লোহার গোলপোস্ট নেটসহ ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। অন্য গোলপোস্টটি কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে বাঁশ দিয়ে। একটি বাঁশের খুঁটিও হেলে রয়েছে। আগে মাঠের চারপাশ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকলেও এখন এক পাশ ছাড়া বাকি অংশ উন্মুক্ত। কংক্রিটের খুঁটির ওপর বাঁশ ও লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে তৈরি বেড়ার যে অংশ টিকে আছে, সেটিও জরাজীর্ণ। ফলে মাঠে প্রবেশে কার্যত কোনো বাধা নেই। স্থানীয়রা বলছেন, বেড়া না থাকায় মাঠে সহজেই আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।

মাঠসংলগ্ন সড়কের পাশে সারি সারি রিকশা-ভ্যান পার্ক করে রাখা হয়েছে। সেগুলোর আশপাশেও জমেছে ময়লা। অন্যদিকে সড়ক উন্নয়নকাজের কারণে কোথাও ছড়িয়ে আছে বালি ও নির্মাণসামগ্রী। এসবের মধ্য দিয়েই চলাচল করছে ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পথচারীরা। সব মিলিয়ে প্যারিস রোডের মাঠটি এখন একই সঙ্গে খেলাধুলার স্থান, নির্মাণসামগ্রী রাখার জায়গা ও আবর্জনা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকায় খেলার মাঠের সংকটের পাশাপাশি বিদ্যমান মাঠগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সবার জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ঢাকা শহরে খেলার মাঠ যে সংখ্যা প্রয়োজন, তার ১০ ভাগের এক ভাগও নেই। আধুনিক নগর পরিকল্পনায় হাঁটা দূরত্বে খেলার মাঠ থাকা কিংবা প্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি খেলার মাঠ থাকা দরকার। সেই হিসাবে ঢাকা শহরে হাজার খানেকের বেশি খেলার মাঠ প্রয়োজন।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এ অধ্যাপক আরো বলেন, ‘খেলার মাঠের সংখ্যা কম—এটা যেমন শহরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি বিদ্যমান মাঠগুলোর অধিকাংশই ক্লাব কিংবা কোনো গোষ্ঠীর দখলে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অবাধে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রেও অনেক মাঠ রাষ্ট্রের চোখের সামনেই দখল হয়ে আছে। আবার অনেক মাঠে খেলার উপযোগী পরিবেশও নেই।’

নতুন খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান মাঠগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করার ওপর গুরুত্ব দেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রীর পক্ষ থেকে নতুন খেলার মাঠ তৈরির ঘোষণা এলেও সেগুলো বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। বিদ্যমান মাঠগুলোকে যদি দখলদারত্বমুক্ত করে খেলার উপযোগী করা না যায়, তাহলে তা খুবই দুঃখজনক। সরকারের উচিত বিদ্যমান মাঠগুলো যাতে সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে প্রতিটি খেলার মাঠ পরিচালনায় এলাকাবাসীর সমন্বয়ে একটি কমিটি করা উচিত। এ কমিটি মাঠে সবার অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো সমস্যা দেখা দিলে সরাসরি সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারবে। সিটি করপোরেশন ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উচিত খেলার মাঠ পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা, যার মূল লক্ষ্য হবে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

খেলার মাঠের উন্নয়নের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে অনেক ক্ষেত্রে মাঠের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমনটি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে বলে জানান নগর পরিকল্পনাবিদরা।

প্যারিস রোডের মাঠটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ। এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মোহাম্মদ শওকত ওসমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

আরও