অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস

বিপ্লবী বাগ্মিতায় রাষ্ট্র সংস্কারের দেজা ভ্যু

গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে দক্ষ শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উঠে আসতে দেখা গেছে।

গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন বা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনে দক্ষ শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই উঠে আসতে দেখা গেছে। বহু দেশের প্রবণতায় দেখা যায়, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের নেতৃত্বে আসেন পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত রাজনীতিক ও পেশাজীবীরা। যাদের বড় অংশই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কিংবা বিদেশ-সংযুক্ত নেটওয়ার্কে গড়ে ওঠা। তারা পুরনো ক্ষমতাকাঠামো ভাঙার কথা বলেন, সংস্কার কমিশন গঠিত হয়, সংলাপ হয়, প্রতিবেদন ও খসড়া তৈরি হয় কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে না। কয়েক বছরের মধ্যেই রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার নজিরও অনেক। এ পুনরাবৃত্তিই রাষ্ট্র সংস্কারে ‘দেজা ভ্যু’ তৈরি করে। এখানে ‘দেজা ভ্যু’ মানে শুধু পরিচিত পরিস্থিতির অনুভূতি নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার চক্র। যেখানে প্রতিশ্রুতি ও বিপ্লবী বাগ্মিতা সামনে থাকে কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘নতুন রাষ্ট্র’ নতুন পথে হাঁটে না; পুরনো ব্যবস্থার ভেতরেই নতুন মুখ বসে যায়। এমনকি কখনো কখনো রাষ্ট্রকে আরো অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেয়।

এ দেজা ভ্যুর সবচেয়ে স্পষ্ট নিদর্শন দেখা গেছে তিউনিসিয়ায়। জেসমিন বিপ্লবের পর দেশ পুনর্গঠনের নেতৃত্বের বড় অংশই ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষিত রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবী। জাইন আবেদিন বেন আলীর পতনের পর দেশে ফিরে বিভিন্ন সময় তিউনিসিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন মনসেফ মারজুকি, মোস্তাফা বেন জাফর, হামাদি জেবালি, মেহদি জমা এবং ইলিয়াস ফাখফাখসহ আরো অনেকে। তারা সবাই ছিলেন পশ্চিমাপন্থী। দেশটিতে ২০১৪ সালে নতুন সংবিধানও গৃহীত হয়। যেটিকে পশ্চিমা দেশগুলো আরব বিশ্বের জন্য মডেল হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু বাস্তবে দেশটিতে কাঠামোগত সংস্কার এগোয়নি। রাজনৈতিক অচলাবস্থা গভীর হয়েছে, অর্থনীতি চাপে পড়েছে, ঋণ বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব কমেনি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর পুরনো আচরণও বদলায়নি। ফলে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কয়েক বছরের মধ্যেই তিউনিসিয়া কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও গণ-আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর রাষ্ট্র সংস্কার বা পুনর্গঠন ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত স্কলার, প্রবাসী বুদ্ধিজীবী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সফল পেশাজীবীদের টেনে আনার প্রবণতা দেখা যায়। পুরনো রাজনৈতিক এলিটদের ওপর জন-অনাস্থার কারণে তাদের হাতে রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। ধারণা করা হয়, তারা ‘নিরপেক্ষ’, ‘দক্ষ’ ও ‘আধুনিক’। কিন্তু বহু দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, এ মডেল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কার এনে দিতে পারে না।

এ বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার মিল খুঁজে পান বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও গত ১৮ মাসে সেই সংস্কার উদ্যোগ ‘দেজা ভ্যু’তে পরিণত হয়েছে। যেখানে নতুন শুরুর কথা বলা হলেও বাস্তবে পুরনো পথই আবার অনুসৃত হতে দেখা যায়।

২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে বাথ পার্টি–শাসিত সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতন ঘটে। দেশটিতে একটি নতুন শাসন কাঠামো দাঁড় করানো হয়। প্রথম ধাপে ইরাকি গভর্নিং কাউন্সিল গঠন করা হয়। নতুন এ শাসন ব্যবস্থার প্রধান মুখ ছিলেন মূলত আহমেদ চালাবি ও পরে ইয়াদ আল্লাউই। চালাবি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন নির্বাসনে ছিলেন এবং ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি ইরাকি গভর্নিং কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য ও পর্যায়ক্রমে চেয়ারম্যান হন। ২০০৪ সালে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হন ইয়াদ আল্লাউই, তিনিও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে ক্ষমতায় আসেন। তাদের সরকার যে প্রধান পদক্ষেপগুলো নেয়, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ডি-বাথিফিকেশন’ বা বাথ পার্টির সদস্যদের সবক্ষেত্র থেকে বাদ দেয়া, সেনাবাহিনী ভেঙে দেয়া, বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কার চালু করা এবং জাতিগত–ধর্মীয় ভারসাম্যের ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা (শিয়া, সুন্নি, কুর্দি কোটা) প্রবর্তন। কিন্তু এ নীতিগুলো দ্রুতই ব্যর্থতার পথে ঠেলে দেয় রাষ্ট্রকে। পুরনো সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ভেঙে দেয়ায় লাখ লাখ সশস্ত্র ও বেকার মানুষ তৈরি হয়। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়; জ্বালানি খাতের আয়ের বড় অংশ রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। দেশটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও দুর্বল শাসন ব্যবস্থার চক্রে আটকে পড়ে।

এছাড়া আফগানিস্তান, লিবিয়া, সুদান, মিসর, ইউক্রেন, ইয়েমেন, আলজেরিয়ার মতো দেশগুলোতে একই ধারা দেখা গেছে। তালেবানদের পতনের পর আফগানিস্তানে হামিদ কারজাই ও আশরাফ গনির নেতৃত্বে পশ্চিমা শিক্ষিত টেকনোক্র্যাটরা রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর মাহমুদ জিবরিল ও আব্দুররহিম এল-কিবের মতো বিদেশে থাকা শিক্ষিত এলিটরা অন্তর্বর্তী সরকারের মুখ হন। তিউনিসিয়ায় বিপ্লবের পর সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সে থাকা বা ফরাসি নেটওয়ার্কে গড়ে ওঠা রাজনীতিকরা। সুদানে আল-বশিরের পতনের পর জাতিসংঘে কাজ করা আব্দাল্লাহ হামদোককে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। ইয়েমেনে আরব বসন্তের পর সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যে থাকা নেতারা ক্ষমতায় আসেন। আলজেরিয়ায় হিরাক আন্দোলনের পর ফ্রান্স-সংযুক্ত প্রশাসনিক এলিটদের দিয়েই ট্রানজিশন চালানো হয়। যদিও এ প্রচেষ্টাগুলোর বেশির ভাগ ব্যর্থ হয়েছে। কোথাও রাষ্ট্র ভেঙে পড়েছে, কোথাও সামরিক বা পুরনো ক্ষমতাকাঠামো ফিরে এসেছে, কোথাও গৃহযুদ্ধ গভীর হয়েছে, আবার কোথাও গণতান্ত্রিক সংস্কার উল্টো পথে হেঁটেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশী পরিবেশে থাকা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এসব পেশাদার স্থানীয় প্রেক্ষাপট, সামাজিক টানাপড়েন বুঝে উঠতে পারেন না। দেশে রাজনৈতিক সংহতি তৈরি না হওয়ায় সংস্কারের পদক্ষেপও টেকে না। আর পুরনো দুর্নীতি-নেটওয়ার্ক ও স্বার্থগোষ্ঠীর কাঠামো ভাঙতে গিয়ে তারা হয় থেমে যান, নয়তো সেই ব্যবস্থারই অংশ হয়ে পড়েন।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যর্থতার অন্যতম কারণ বিদেশ-সংযুক্ত এ পেশাজীবীদের দৃষ্টিভঙ্গি। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে তাদের কার্যকর সংযোগ তৈরি হয় না। ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ সর্বজনীন সংস্কারের বদলে নিজস্ব গোষ্ঠী ও নেটওয়ার্কের পৃষ্ঠপোষকতা। বিদেশ-সংযুক্ত এলিটরা রাষ্ট্র সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে তারা সিদ্ধান্ত ও সুযোগ বণ্টনের ক্ষেত্রে নিজেদের পরিচিত বৃত্ত ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোকদের অগ্রাধিকার দেন। এতে সংস্কার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া না হয়ে অভিজাত প্রকল্পে রূপ নেয়। স্থানীয় জনগণ ও ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী এতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পায় না। ফলে সংস্কারের প্রতি আস্থা তৈরি হয় না এবং তা দ্রুত রাজনৈতিক বিরোধ ও সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশে থাকা নেতৃত্বের সংস্কার উদ্যোগ একটি নির্দিষ্ট ছকে এগোয়। কিছু বৈঠক হয়, প্রতিবেদন হয়, কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, তারপর তারা সরে যান। অর্থাৎ সংলাপ হয়, খসড়া তৈরি হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দাঁড়ায় না। সংস্কার হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডিত উদ্যোগের সমষ্টি। এটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মতো ধারাবাহিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে না। সুদানে আব্দাল্লাহ হামদোক সরকারের সংস্কার কর্মসূচি অনেকটাই নির্ভর করেছিল আন্তর্জাতিক সহায়তা ও নীতি-পরামর্শের ওপর। কিন্তু মাঠপর্যায়ে শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকায় সেই উদ্যোগ টেকেনি। ইয়েমেনে আরব বসন্তের পর ট্রানজিশন প্রক্রিয়াও ছিল মূলত প্রকল্পনির্ভর। সংলাপ ও খসড়া থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

এছাড়া পশ্চিমে বসবাস করা এমন নেতৃত্বের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব থাকে। তাদের সামাজিক ভিত্তি সাধারণত শহরকেন্দ্রিক, শিক্ষিত ও প্রশাসনিক-আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কনির্ভর। গ্রামীণ দরিদ্র, বেকার তরুণ কিংবা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষ—যাদের ক্ষোভ থেকেই মূলত গণ-আন্দোলনের জন্ম—তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় জায়গা পান না। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। ব্যর্থতার আরেকটি বড় কারণ সংহতির অভাব। বিদেশ-সংযুক্ত এলিটরা সাধারণত একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হন না। তারা দল, মতাদর্শ ও পেশাগত নেটওয়ার্ক অনুযায়ী বিভক্ত থাকেন। ফলে একটি সুসংগঠিত সংস্কার ব্লক তৈরি হয় না। এছাড়া ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে তারা কাজ করেছেন, সেখানে নিয়ম মানার প্রবণতা থাকে, বিচার ব্যবস্থা তুলনামূলক স্বাধীন এবং সিদ্ধান্ত হয় তথ্যভিত্তিক। সে অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই তারা দেশে ফিরে নীতি প্রণয়ন করেন। কিন্তু বাস্তবে তারা দেখেন দুর্নীতিগ্রস্ত ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন কাঠামো। যেটা তার ভাঙতে পারেন না। এ ব্যবধানের কারণে তাদের নীতিমালা বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য হয় না এবং কাগজেই আটকে থাকে।

বিদেশফেরত পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত নেতৃত্ব নিজেদের পরিচিত বৃত্ত, বন্ধু, এনজিও বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সহকর্মীদের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেন। ফলে সংস্কার কর্মসূচি নীতিপর্যায় থেকে নিচের স্তরে পৌঁছাতে পারে না। সংস্কারকরা দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলেন। কিন্তু প্রশাসন চালাতে গিয়ে তাদের সে পুরনো ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হয়। ধীরে ধীরে তারা ওই ব্যবস্থার অংশ হয়ে পড়েন। ইরাকে প্রবাসী নেতৃত্ব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেও তেল ও চুক্তিনির্ভর রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক অনুদান নিজেই দুর্নীতির উৎসে পরিণত হয়। তিউনিসিয়ায় পুরনো আমলাতন্ত্র প্রায় অক্ষত থেকে যায়। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের বদলে পুরনো কাঠামোর ভেতরেই নতুন মুখ বসে যায়, আর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয় না।

এ বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হলেও মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেনি। দায়িত্ব নেয়ার মাসখানেকের মাথায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভয়েস অব আমেরিকাকে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ছাত্ররা বলেছে আমরা রিসেট বাটন পুশ করেছি; এভরিথিং ইজ গন; অতীত নিশ্চিতভাবে চলে গেছে। এখন নতুন ভঙ্গিতে আমরা গড়ে তুলব। দেশের মানুষও তা চায়। সেই নতুন ভঙ্গিতে গড়ে তোলার জন্য আমাদের সংস্কার করতে হবে।’ এছাড়া বিভিন্ন সময় তিনি উল্লেখ করেছেন, জুলাই বিপ্লবের মূল কথাই ছিল সংস্কার। তার সরকার সেই সংস্কার করতে বদ্ধপরিকর।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তবে সবার আগে যেখানে সংস্কার জরুরি ছিল, সে আমলাতন্ত্রের প্রশাসনিক সংস্কৃতি আগের মতো রয়ে গেছে। দেশে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির চিত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আমলে যেসব খাতে ঘুস, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে। ফলে দুর্নীতির কাঠামো ভাঙার বদলে তা টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে দলবাজি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও গভর্ন্যান্স স্পেসের ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে ঠিকই একটি মহল দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। দুর্নীতি দমন ও জনপ্রশাসন সংস্কার—এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও বাস্তবে সেখানে অগ্রগতি দেখা যায়নি। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন যে সার্বিক সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কমিশনের প্রস্তাবের মধ্য থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন ও সীমিত বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন হয়নি। যেসব প্রস্তাব অধ্যাদেশ বা সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’

অর্থনৈতিক চাপের দিক থেকেও উদ্বেগ বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন ও ঋণগ্রহণে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা হওয়ার পথে। এ সরকারের মেয়াদে নেয়া বিপুল এ ঋণের বড় অংশ পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধই এখন সরকারের ব্যয়ের প্রধান খাত। এ কারণে বড় অংকের ঋণের বোঝা বাড়িয়েও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে কর্মসংস্থান না বেড়ে উল্টো সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিও এখন ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। যেখানে একই সময়ে সরকারের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশেরও বেশি। বেসরকারি খাত সংকুচিত হওয়ায় দেশের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরেও বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের অন্যতম এ উপাদানের আমদানি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ছয় মাস ধরে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চলছে।

দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নতির কোনো ইঙ্গিত মেলেনি। গত ১৬ মাসে বিদেশী বিনিয়োগেও তেমন গতি নেই। দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের হার ছিল ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটি কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। শেষ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে ২৮১ কোটি ডলারের, যা কিনা আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কর কিংবা রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি বাড়েনি। ফলে ঋণের বোঝা বাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, ‘সবার তো সরকার চালানোর মতো অভিজ্ঞতা থাকে না। সঠিক লোককে সঠিক কাজের জন্য বেছে নেয়াটা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সবাইকে দিয়ে তো সব কাজ হবে না। সামগ্রিকভাবে নেতৃত্ব দেন একজন কিন্তু তার সঙ্গে থাকা মানুষগুলোর কর্মদক্ষতাও বড় ভূমিকা রাখে। আগামীতে নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।’

শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ দীর্ঘ শাসনামলে আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বৈষম্যমূলক নীতি পাল্টে উন্নয়ন বরাদ্দে ভারসাম্য আনার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি হয়নি; বরং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সরকারি বরাদ্দে আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ১৫৩টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে এবং মোট বরাদ্দ প্রায় ২ লাখ সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বিভাগ একাই যার ৪২ শতাংশ পেয়েছে। বিপরীতে দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। রাজশাহী ১ দশমিক ৩৮ এবং বরিশালের বরাদ্দ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে গেছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের বেশির ভাগ একই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌফিক জোয়ার্দার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর যে প্রত্যাশা চাপানো হয়েছিল সেটা আমি ঠিক বলে মনে করি না। সংস্কার করাও তাদের মূল কাজ ছিল না। বিভিন্ন চুক্তি বা নীতিগত বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো পদক্ষেপগুলোও তাদের ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না। এ ধরনের উদ্যোগে মনোযোগ না দিয়ে তাদের উচিত ছিল নির্বাচন আরো আগে দেয়ায় মনোযোগী হওয়া। অর্থাৎ নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ন্যূনতম পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার, সেটুকু তৈরি করে দ্রুত নির্বাচন দেয়া। এর বাইরে এ সরকার যা করা হয়েছে, তা সবই বাহুল্য। এসব করার তেমন প্রয়োজন ছিল না।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার আনার বিপ্লবী বাগ্মিতায় যতটা উচ্চকণ্ঠ ছিল, তাদের বাস্তব অগ্রাধিকার তালিকা ততটাই ভিন্ন। সংস্কারকে অগ্রভাগে রাখার দাবি করলেও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে রাষ্ট্রীয় কেনাকাটা, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বড় অবকাঠামো। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারে এমন কিছু উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী আছেন যারা বাংলাদেশে থাকেন না। অনেকে বিদেশী নাগরিক; কারো হয়তো বাংলাদেশী নাগরিকত্ব থাকতে পারে। তবে তারা সংস্কারক হিসেবে সক্রিয় নন। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদনে তাদের আগ্রহ বেশি। বড় বড় সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াতেও তাদের ঝোঁক দেখা যায়। এগুলো কিসের সংস্কার? বন্দর বিদেশী কোম্পানির হাতে দেয়াই-বা কোন সংস্কারের মধ্যে পড়ে?’ তার মতে, এসব উদ্যোগ গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বিরোধী।

এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘সরকার চাইলে অনেক সংস্কার ও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারত, কিন্তু তা করেনি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কোনো বাস্তব সংস্কার হয়নি। আমলাতন্ত্র ও পুলিশ ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। মামলা-বাণিজ্য বন্ধে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। উল্টো মব ভায়োলেন্স বেড়েছে। সফলতা বলতে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের কিছু অংশ জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা—এটাই তাদের একমাত্র অবদান।’ তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গড়া কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যাত্রা করেছে ঠিক উল্টো পথে।

তবে এখনই অন্তর্বর্তী সরকারকে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক সৈয়দা লাসনা কবীর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ সরকারের অনেকে আছেন যারা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকেছেন। তারা নিজ নিজ পেশার ক্ষেত্রে সফল, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাই বলে তারা সবকিছুই বুঝবেন বা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলবেন এটা ধরে নেয়া ভুল। অনেকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তারা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন, দেশীয় সংস্কৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তুলনামূলক কম ছিল। দেশের বাস্তবতা তারা কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছেন—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। এটা ঠিক নয় যে তারা কিছুই করতে পারেননি; আবার অনেক কিছু করে ফেলেছেন এটাও বলা যাবে না।’

আরও