দেশে পাঁচ বছরে এলপিজির চাহিদা বাড়বে ৬০ শতাংশ

দেশে বর্তমানে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার ১৫ লাখ টনের ওপর। স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস এবং বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজির ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে।

দেশে বর্তমানে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার ১৫ লাখ টনের ওপর। স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস এবং বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় এলপিজির ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে। সেই সঙ্গে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় শিল্প-কারখানায়ও বাড়ছে এ গ্যাসের ব্যবহার। ক্রমান্বয়ে এলপিজির ব্যবহার বাড়ায় আগামী ২০৩০ সালে পণ্যটির ব্যবহার ২৫ লাখ টনে পৌঁছাবে। সেই হিসাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে এলপিজির চাহিদা আরো ১০ লাখ টন বা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

পর্যায়ক্রমে ২০৪১ সালে এলপিজির চাহিদা ৫০ লাখ টনে উন্নীত হবে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে দেশের শিল্প খাতকে সরিয়ে আনতে হলে এটি সহজ বিকল্পও হতে পারে। তবে এলপিজি খাতের প্রসার ও জনসাধারণের কাছে এটিকে সহজলভ্য করতে পলিসি প্রয়োজন।

রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে গতকাল এলপিজি নিয়ে অনুষ্ঠিত পলিসি কনক্লেভের মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য উঠে আসে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম। ‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক এ কনক্লেভের আয়োজন করে বণিক বার্তা।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশে প্রাইমারি এনার্জির ৬৫ শতাংশই আমদানি হচ্ছে। তেল ও কয়লার পুরোটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাসের বৃহৎ অংশও আমদানি করতে হচ্ছে। বিপরীতে স্থানীয় গ্যাসের উত্তোলন ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর অন্তত ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যাচ্ছে। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও সেখানে ভালো সংবাদ নেই। ক্রমান্বয়ে সাশ্রয়ী দামে সরবরাহ বাড়ানো গেলে গ্যাসের বড় বিকল্প হতে পারে এলপিজি।’

দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এলপিজির ব্যবহার ছিল সাত লাখ টন। পরের অর্থবছরে সাড়ে আট লাখ টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ১০ লাখ টনে উন্নীত হয়। পর্যায়ক্রমে চাহিদা বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হয় প্রায় ১৫ লাখ (১ দশমিক ৪৪) টনের কাছাকাছি। কনক্লেভের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে প্রতি বছর যে পরিমাণ এলপিজির চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তার ৯৮ শতাংশই আসছে বেসরকারিভাবে। মাত্র ২ শতাংশ এলপিজি সরকারিভাবে সরবরাহ হচ্ছে। এ খাতে ৫৮টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিলেও মাত্র ২৭টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে এলপিজি অপারেটর হিসেবে নিয়োজিত।

দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়লেও এখন পর্যন্ত শিল্পে বড় আকারে ব্যবহার দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং সরকারি সহযোগিতা ও অবকাঠামো বাড়ানো গেলে বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পেও এর বড় প্রসার হতে পারে। মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট এলপিজির ৮০ শতাংশ বাসাবাড়িতে, শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানে ১২ শতাংশ এবং অটোগ্যাস খাতে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৮ শতাংশ।

দেশে স্থানীয় গ্যাসেরও হালচিত্র তুলে ধরা হয় মূল প্রবন্ধে। তাতে উঠে আসে, প্রতিদিন স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট মার্কিন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্র থেকে আসছে। যদিও বিবিয়ানায় কমে আসছে গ্যাসের মজুদ। এ ক্ষেত্রটি বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস চাহিদা ও সরবরাহের বিভিন্ন তথ্য বলছে, ২০২৯-৩০ সালে দেশে পাঁচ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের, যেখানে সরবরাহ হচ্ছে কেবল ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।

দেশে গ্যাসের ৫৯ শতাংশ বিদ্যুতে ব্যবহার হচ্ছে, যার মধ্যে ক্যাপটিভে ১৮ শতাংশ। আর বাকি ১১ শতাংশ বাসাবাড়িতে, ১৮ শতাংশ শিল্প খাতে, সার উৎপাদনে ৬ শতাংশ এবং সিএনজিতে ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। এ জায়গায় এলপিজি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এখনো দেশের মোট জ্বালানি চাহিদায় এলপি গ্যাসের হিস্যা মাত্র ২ শতাংশ।

বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, ‘এলপিজি একমাত্র জ্বালানি, যা কোনো ধরনের ভর্তুকি ছাড়াই গড়ে উঠেছে এবং টিকেও আছে। এটির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে শিল্পকে সরিয়ে আনতে হলে এলপিজি সহজ বিকল্প অপশন হতে পারে। এ খাতের প্রসার ও জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য করতে শক্ত নীতিমালা প্রয়োজন। শুধু বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে হবে না, এ খাতে সরকারি খাতের অংশগ্রহণও বড় আকারে প্রয়োজন।’

কনক্লেভে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও প্রায় একই তথ্য দেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১২ লাখ টন এলপিজি আমদানি করে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। ক্রমবর্ধমান আমদানি চাহিদা জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই এলপিজি খাতে নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি খাতকে বিকশিত করা গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।’

আরও