মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ ১৬ মাসে সর্বোচ্চ

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসে সর্বোচ্চ।

কোরবানি ঈদের মাসে সব খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং এপ্রিলে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে আগামীতে এ হার আরো বাড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গতকাল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগে এপ্রিলে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। গত বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রথম সাত মাস ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে। মার্চে আবারো ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসে। তবে গত এপ্রিল ও মে মাসে এ হার আবারো বাড়তে শুরু করেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানির সঙ্গে সব পণ্যের দামের সংযোগ রয়েছে। সরকার জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের জন্য দাম বাড়ালেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে। এছাড়া ঈদুল আজহা ঘিরে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। সরকার জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানার কথা বললেও সেটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। জুনে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। মূল্যস্ফীতিতে এটারও প্রভাব পড়বে।

এপ্রিলে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ ও পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়। ওই মাসে গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়। মে মাসের শেষ দিনে আবারো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। তবে জুনের প্রথম দিন থেকে মূল্য কার্যকর হওয়ায় তা মে মাসের মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলেনি। এছাড়া গত সপ্তাহে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীসহ দেশের জেলা ও বিভাগীয় শহরের সরবরাহ চেইন নির্ভর করে উৎপাদন ও পরিবহনের খরচের ওপর। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে তার প্রভাব সরাসরি পণ্যের ওপর পড়ছে।

পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব পড়েছে মে মাসের কোরবানির বাজারেও। সিরাজগঞ্জ কিংবা জামালপুর থেকে আসা গরুর ট্রাকপ্রতি ভাড়া গুনতে হয়েছে ২৮ হাজার টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১০-১২ হাজার টাকা বেশি। কোরবানি ঈদে পশুর মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল পরিবহন খরচ। জামালপুর থেকে রাজধানীতে গরু বিক্রি করতে আসা ব্যাপারী সরোয়ার বলেন, ‘আগে যেখানে ১৬ হাজার টাকায় ঢাকায় গরু আনা গেছে, সেখানে এবার ২৮ হাজার দিতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে গরুর দাম বাড়বে।’

বিবিএসের তথ্যমতে, গত মে মাসে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত সব পণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। এপ্রিলে ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এদিকে গ্রাম ও শহরেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গ্রামে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং শহরে ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। শহর ও গ্রামে খাদ্য, খাদ্য-বহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।

সরকার নতুন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আগামীতে আরো বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। মূল্যস্ফীতি বাড়লে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির গুরুত্ব আরো বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

বণিক বার্তাকে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না, এর অন্যতম কারণ হতে পারে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। বাজার তদারকিতে যারা আছেন তাদের পদক্ষেপ কাজে আসছে না। নতুন সরকার জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার কথা বললেও সেটা দেখা যাচ্ছে না। এ মাসে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় এটি আরো উসকে দেবে। হতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বাজারকে রাখতে হলে পদক্ষেপ নিতে হবে। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানে সেটার চাপ বাড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এখান থেকে উত্তরণের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ তৈরি করা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বৃদ্ধি করা। বিনিয়োগ না এলে মানুষের হাতে টাকা আসবে না। আবার সুরক্ষা কর্মসূচি না নিলে নিম্নবিত্তরা আয়ের সুযোগ পাবে না। তাই এসব জায়গায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’

বিবিএসের তথ্যমতে, দেশে কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সে তুলনায় বাড়ছে না মজুরির হার। গত মে মাসে শ্রমের মজুরি এপ্রিলের তুলনায় সামান্য বেড়েছে। মে মাসে মজুরির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা এপ্রিলে ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিন খাতেই মজুরি বেড়েছে সামান্য।

আরও