রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) নিয়মিত শিক্ষার্থীরা সেশনজট, ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা ও একাডেমিক অনিশ্চয়তার বেড়াজালে বছরের পর বছর আটকে আছেন। এখানে স্নাতক (সম্মান) কোর্সের একেকটি সেমিস্টার শেষ হতে যেমন দ্বিগুণ সময় লাগছে, তেমনি ফল পেতেও অপেক্ষা করতে হচ্ছে মাসের পর মাস। অথচ একই ইনস্টিটিউটের সান্ধ্যকালীন কোর্স চলছে নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই।
বিভাগটির শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বারবার সমস্যা জানানোর পরও কার্যকর কোনো সমাধান মিলছে না। বরং হুমকি ও উপেক্ষার শিকার হতে হচ্ছে তাদের।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতা মিলিয়ে তাদের একাডেমিক জীবন থমকে গেছে। অন্যদিকে একই ইনস্টিটিউটের সান্ধ্যকালীন কোর্স নির্ধারিত সময়েই চললেও নিয়মিত শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, আইইআর এখন রাবির সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা একাডেমিক ইউনিট। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনো মাস্টার্স শেষ করতে পারেননি। অথচ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে মাস্টার্সের শেষ ধাপে রয়েছে। এমনকি অনেক বিভাগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও মাস্টার্সে পড়ছেন।
তবে আইইআরের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনো চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে। প্রতিটি ব্যাচেই অন্য বিভাগের তুলনায় সাত-আট মাস পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া বিভাগটির প্রতিটি ব্যাচের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশেও ধীরগতির নজির দেখা যায়।
শিক্ষার্থীরা আরো অভিযোগ করেছেন, পরীক্ষার পর ছয়-সাত মাস পেরিয়ে গেলেও ফলাফল আসে না। কখনো কখনো এক সেমিস্টারের পরীক্ষা চলার মাঝেই আগের সেমিস্টারের রেজাল্ট প্রকাশ হয়, যা আরো বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। ২০২৪ সালের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে উন্নয়ন হলেও আইইআরে সেভাবে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং সমস্যাগুলো আরো প্রকট আকার ধারণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, বিভাগের ছয় মাসের কোর্স শেষ করতে লাগে এক বছর। শিক্ষকদের অনেকবার বলা হয়েছে। তারা শুধু আশ্বাস দেন। বাস্তব কোনো সমাধান পাওয়া যায় না। ২০১৫-১৬ থেকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত একক পরীক্ষকের মাধ্যমে খাতা মূল্যায়ন হয়েছে। কেউ কথা বললেই হুমকির মুখে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ আরো বেড়েছে।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আইইআর ছাড়া অন্য বিভাগগুলোতেও শিক্ষক সংকট আছে। কিন্তু তারা ঠিকমতো ক্লাস ও পরীক্ষা শেষ করছে। তাহলে এই বিভাগ কেন পারছে না? মানসম্মত শিক্ষা চাইলে আগে সময়মতো ক্লাস এবং পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে আইইআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার বানু বণিক বার্তাকে বলেন, আমি কাউকে হুমকি দিইনি। কেউ হুমকি দিয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই। রেজাল্ট দেরির পেছনে অনেক কারণ আছে। করোনায় দুই বছর গ্যাপ পড়েছে। আমরা সেশনজট সাত মাসে নামিয়ে এনেছি, আরো কমানোর চেষ্টা করছি। আমাদের একসঙ্গে অনার্স, মাস্টার্স, সান্ধ্য কোর্স চালাতে হয়। শিক্ষক সংকটও আছে।
তিনি জানান, তিনি নিজেই সাত-আটটি কোর্স পড়ান। একইসঙ্গে অফিশিয়াল কাজও করতে হয়। অন্য বিভাগ থেকে যারা ক্লাস নিতে আসেন, তারা নিয়মমতো ক্লাস নেন না। তবুও তারা ক্লাস নিচ্ছেন, এটাকেই তিনি সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
ড. আকতার বানু বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাঁচজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা চলে যাওয়ায় এখন আবার নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করে নিয়োগ দিতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০০১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমদিকে শুধু মাস্টার্স ও সান্ধ্যকালীন কোর্স থাকলেও ২০১৬ সাল থেকে চালু হয় অনার্স কোর্স। তখন থেকেই নিয়মিত শিক্ষার্থীরা একের পর এক সমস্যার মুখে পড়ছেন।