একনেকে উঠছে সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

শুষ্ক মৌসুমে ৬২৩ নদীতে পানিপ্রবাহের আশা

বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতাহারে অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল পদ্মা ব্যারাজ।

১৯৬০-এর দশক থেকে ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলের নদী, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের দাবি উঠলেও প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের প্রায় ৬২৩টি ছোট-বড় নদ-নদীতে ফিরবে প্রাণ, বাড়বে পানির প্রাপ্যতা। একই সঙ্গে প্রায় ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমি আবাদে পাওয়া যাবে সেচের পানি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদীপারের কৃষকরা উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে খুলনা, রাজশাহী অঞ্চলের সুপেয় পানি সংকট কাটবে, পাশাপাশি কমবে লবণাক্ততা, প্রাণ ফিরে পাবে মৃতপ্রায় নদ-নদীগুলো। কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের জন্য আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি গত কয়েক দশকে অনেকবার আলোচনায় এসেছে। তবে প্রতিবারই বিভিন্ন কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি একনেকে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে আসে। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর বর্তমান নির্বাচিত সরকার পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা দেয়।

প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে অবকাঠামো, হাইড্রোপ্লান্টসহ বিভিন্ন স্পিলওয়ে গেট, নেভিগেশন লক ও দুটি ফিশ পাস। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে সামনের মাসে কাজ শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৩৩ সালের জুনে।

জানতে চাইলে পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি অনুমোদন হলে প্রথম পর্যায়ে মূলত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, গড়াই অফটেক স্ট্রাকচার, চন্দনা নদীর মুখে কন্ট্রোল স্ট্রাকচার, কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী সিস্টেমের উন্নয়ন ও খনন এবং পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার কাজ হবে। পাশাপাশি গড়াই অংশে হাইড্রোপাওয়ারের ব্যবস্থাও থাকবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা যাবে। সেচের জন্য মিলবে পর্যাপ্ত পানি। এতে শুষ্ক মৌসুমে আবাদ বাড়বে এবং অনেক এলাকায় একাধিক ফসল উৎপাদনও সম্ভব হবে। ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে।’

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সূত্রে জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে পদ্মা নদীর রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় বাঁধ এবং আরো কয়েকটি স্থানে আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা ও বরিশাল জেলার বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য পদ্মা নদী ভূ-উপরিস্থ সুপেয় পানির একমাত্র উৎস। এ নদীতে প্রবাহিত পানি বর্ষা-পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত প্রবাহই এ অঞ্চলের পানি সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রকল্পের অধীন নির্মাণ হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার ব্যারাজ, ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার। পাশাপাশি ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেটও থাকবে। নৌযান চলাচলের জন্য ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস রাখা হবে।

প্রকল্পে ব্যারাজ এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৬০২ কোটি টাকা। এছাড়া ইলেকট্রিক ওয়ার্কস ও হাইড্রোপাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে ৭৪৩ কোটি, গড়াই অফ-টেক-সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিক ওয়ার্কস ও হাইড্রোপাওয়ার প্লান্ট নির্মাণে ৪১৯ কোটি, গড়াই ও মধুমতী নদী ড্রেজিংয়ে ১ হাজার ২০৮ কোটি, হিসনা নদী সিস্টেমের নিষ্কাশন ও পুনঃখননে ১ হাজার ৩৪১ কোটি, এফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণে ৭০৬ কোটি এবং চন্দনা ও হিসনা অফ-টেক অবকাঠামো নির্মাণে ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর মাধ্যমে চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০ উপজেলার মানুষ উপকৃত হবে। এর মধ্যে পদ্মা ও যমুনা নদীর শাখা নদী হিসনা, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, চন্দনা, বড়াল, ইছামতিসহ প্রায় ৬২৩টি ছোট-বড় নদ-নদী পানির সহজপ্রাপ্যতা পাবে। এর আওতায় আসবে বিভিন্ন শাখা নদী, উপনদী, খাল, বিল, জলাধার এবং এতে পানিপ্রবাহের নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি—পাঁচটি নদী ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস; স্বাদু পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে সুন্দরবন ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ও বনসম্পদ সংরক্ষণ করা হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পলি অপসারণ করে যশোরের ভবদহসহ অন্যান্য এলাকার জলাবদ্ধতা হ্রাস ও পদ্মানির্ভর এলাকার নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

জানতে চাইলে লেখক ও গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি ধরে রাখা হলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর তুলনামূলক উঁচু রাখা সম্ভব হবে। ব্যারাজে সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদীপথে ডাইভার্ট করা হবে, যার লক্ষ্য শুকনা মৌসুমে এসব নদীতে পানিপ্রবাহ সচল রাখা। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট কমানো।’

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লীপ্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৩ মে বর্তমান সরকারের তৃতীয় একনেকে প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতিত্ব করবেন। প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকছে।

কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লীপ্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটির সমীক্ষা, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে। কয়েক মাস আগে প্রকল্পটির ডিপিপি আমাদের কাছে আসে। আমরা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় মতামত দিয়েছি। এটি যেহেতু প্রয়োজনীয় প্রকল্প সেজন্য আমরা অনুমোদনের সুপারিশ করেছি।’

নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এক জনসভায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর ব্যারাজ প্রকল্পটি অনুমোদনের ইঙ্গিত দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সে সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ, সেটার স্টাডি রিপোর্ট, কারিগরি দিক, সমীক্ষা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। একনেক সভা যেদিন হবে সেদিন প্রকল্পটি উপস্থাপন হবে। ব্যারাজটি বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগণের সুবিধার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এ প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ এর আগে গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বেও পানিসম্পদমন্ত্রী নির্বাচনী ইশতাহার অনুযায়ী পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কথা জানান।

পদ্মা ব্যারেজ ও গড়াই অফ-টেক স্ট্রাকচারে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। বছরে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে, যা হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদের ব্যবস্থায় প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে। এছাড়া গড়াই ও বড়াল নদ পুনরুজ্জীবিত করতে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার খনন করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে এ ব্যারাজ দিয়ে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ড পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও