স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান

গণমাধ্যমে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করা হবে না এবং কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে না। বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) ইউনেস্কো ও ইউএনডিপি পরিচালিত ‘বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি: স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক গণমাধ্যমের মূল্যায়ন’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

এ যৌথ প্রতিবেদনে সহায়তা করে ঢাকাস্থ সুইজারল্যান্ড দূতাবাস। প্রতিবেদনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফিউচার অব স্পিচ’ প্রকল্পের সিনিয়র লিগ্যাল ফেলো প্রফেসর ড. জোয়ান বারাতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীম রেজা।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করতে যাচ্ছি না, আবার সরকারবিরোধী সংবাদ প্রকাশের জন্য কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া বা গণমাধ্যমে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না সরকার। তবে স্বাধীনতা উপভোগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নৈতিক সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটাতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তার লক্ষ্য অনুযায়ী এখনো জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। গণমাধ্যমকে এই অবস্থায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যমকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলকভাবে পরিচালনার পথ খুঁজে বের করতে হবে।”

মাহফুজ আলম বলেন, ‘সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হিসেবে গণমাধ্যমের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে সাংবাদিকতার সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে, ব্যক্তিগত সাংবাদিকদের সুরক্ষায় নয়, বরং পেশার সুরক্ষায়। সাংবাদিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে সরকার বেতন বোর্ড বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইন, শ্রম ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বানের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এটি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গণমাধ্যম এখনো রাজনৈতিক চাপ ও কঠোর আইনের মুখে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজ, একাডেমিক ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে তৈরি এ গবেষণায় বলা হয়েছে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনআস্থা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে।

প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো, সংবাদকক্ষে নারী প্রতিনিধিত্ব ও আদিবাসী-কমিউনিটি মিডিয়ার জন্য সহায়তা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে পেশাগত মান উন্নয়ন ও গণমাধ্যম শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) বাংলাদেশে আবাসিক প্রতিনিধি (ভারপ্রাপ্ত) সোনালি দয়ারত্নে বলেন, ‘একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম। এই মূল্যায়ন প্রতিবেদন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। গণমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষায় এখনই কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।’

সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের কাউন্সেলর ও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাগের প্রধান আলবের্তো জিওভানেত্তি বলেন, ‘এ মূল্যায়ন একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ, যা গণমাধ্যমের মৌলিক স্বাধীনতা সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে।’

অনুষ্ঠানে ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের একটি মৌলিক স্তম্ভ। মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি ন্যায্য সমাজ গড়তে চাইলে, গণমাধ্যমকে স্বাধীন রাখতে হবে।’

মূল প্রতিবেদনে ৬টি প্রস্তাবনার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইনি সংস্কার, স্বচ্ছ বিজ্ঞাপন নীতিমালা ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি, স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণ কাঠামো গঠন, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, মিডিয়া সাক্ষরতা বাড়ানো ও পেশাগত মানোন্নয়ন।

আরও