জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগ

প্রতিষ্ঠার পর দেড় দশকে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিতে গেছেন ৬১ শিক্ষার্থী

দেশভিত্তিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন ৪০ জন এবং যুক্তরাজ্যে ১১ জন। এছাড়া কানাডা, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ায় দুজন করে এবং ফিনল্যান্ডে একজন শিক্ষার্থী গেছেন। অন্যান্য দেশেও কয়েকজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ প্রতিষ্ঠা হয় ২০১১ সালে। প্রতিষ্ঠার পর মাত্র দেড় দশকে বিভাগটি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে সাফল্যের নজির। বিভাগের ৪১তম থেকে ৪৯তম ব্যাচের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬১ জন শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪২ জন পিএইচডি ও ১৯ জন এমএস পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৫ জন ফুল ফান্ডিং, ১২ জন আংশিক ফান্ডিং এবং চারজন কমনওয়েলথ ফান্ডিংয়ের আওতায় রয়েছেন।

ব্যাচভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন ৪২তম ও ৪৬তম ব্যাচ থেকে। এ দুই ব্যাচের ১১ জন করে শিক্ষার্থী বিদেশে গেছেন। ৪৭তম ব্যাচ থেকে ১০ জন, ৪৩তম থেকে আটজন, ৪১তম থেকে সাতজন, ৪৪তম ও ৪৫তম থেকে পাঁচজন করে এবং ৪৮তম ও ৪৯তম ব্যাচ থেকে দুজন করে শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চ শিক্ষায় গেছেন।

দেশভিত্তিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন ৪০ জন এবং যুক্তরাজ্যে ১১ জন। এছাড়া কানাডা, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ায় দুজন করে এবং ফিনল্যান্ডে একজন শিক্ষার্থী গেছেন। অন্যান্য দেশেও কয়েকজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষা নিচ্ছেন।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাবিতেই প্রথম স্নাতক পর্যায়ে পাবলিক হেলথ বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। বর্তমানে বিভাগটিতে স্নাতকের পাশাপাশি মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি করার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাক্রমে এপিডেমিওলজি, বায়োস্ট্যাটিস্টিকস, পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, পরিবেশগত স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্রজনন ও শিশুস্বাস্থ্য, গ্লোবাল হেলথ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উচ্চতর পর্যায়ে অ্যাডভান্সড এপিডেমিওলজি, বায়োইনফরমেটিকস, ট্রপিক্যাল ডিজিজ, আরবান হেলথ ও অ্যাডভান্সড বায়োস্ট্যাটিস্টিকসের মতো বিষয়েও পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

বিভাগের শিক্ষার্থীদের কয়েকজন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান, গবেষণামুখী শিক্ষা, গবেষণাপত্র প্রকাশের অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষকদের সহযোগিতা বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে রাখছে।

বিভাগটির শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে দেশের জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশদূষণ, অপুষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, সংক্রামক রোগ, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, নগর স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার মতো নানা বিষয়ে বাংলাদেশে গবেষণার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদেশে উচ্চ শিক্ষার আবেদনে শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে।

বিভাগের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহামে উচ্চতর গবেষণা করছেন। তার ২৪০টিরও বেশি গবেষণাপত্র এবং ১৪ হাজারের বেশি সাইটেশন রয়েছে। অ্যালপার-ডগার ও স্ট্যানফোর্ড-এলসেভিয়ারের বিশ্বসেরা ২ শতাংশ গবেষকের তালিকায় তিনি টানা পাঁচ বছর স্থান পেয়েছেন। স্কোপাসের তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশনে তার ১৯৪টি গবেষণাপত্র রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্যতম শীর্ষ গবেষক হিসেবে তিনি দেশেরও উল্লেখযোগ্য গবেষকদের একজন।

আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘যখন দেখি আমার সিনিয়র, জুনিয়র, ব্যাচমেটরা বেশ ভালো ভালো জায়গায় বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করছে, খুব ভালো লাগে। যারা প্রথম দিকের ব্যাচ, তাদের গাইড করার মতো তেমন কেউ ছিল না। বর্তমানে বিভাগের অনেক সাবেক শিক্ষার্থী বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। তাদের কাছে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা পরামর্শ এবং গাইড নিতে পারছেন। তাই বর্তমান শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যটা ঠিক রেখে এগিয়ে যেতে হবে।’

বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর অন্যতম লক্ষ্য ছিল শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা। মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর পর শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয় পর্যায়েই গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিভাগটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। পাবলিক হেলথ, পপুলেশন ও কমিউনিটিকেন্দ্রিক গবেষণায় ব্যয়বহুল ল্যাবের প্রয়োজন কম থাকায় সীমিত সম্পদেও গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এ ধরনের সাফল্য আমাদের জন্য গর্বের। বাংলাদেশে পাবলিক হেলথের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত হলেও বিদেশে এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। বাংলাদেশের নানা জনস্বাস্থ্য সমস্যা শিক্ষার্থীদের গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং বিদেশে গবেষণার চাহিদার কারণে প্রতি বছর বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন।’

বিদেশে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভাগের গবেষণামুখী পরিবেশের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের ইন্টারন্যাশনাল হেলথ বিভাগে পিএইচডি করছেন। বিভাগের পঞ্চম ব্যাচের সাবেক এ শিক্ষার্থী পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন।

আরও