লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে বরিশাল দুগ্ধ ও গবাদিজাত উন্নয়ন খামার

জনবল, অবকাঠামো সংকটসহ বিভিন্ন কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে বরিশালের একমাত্র দুগ্ধ ও গবাদিজাত উন্নয়ন খামার। দুই বছর ধরে দুগ্ধ ও গর্ভবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে বাছুর ও দুধ উৎপাদন। খামার কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবল সংকটের কারণে খামারটি পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে

জনবল, অবকাঠামো সংকটসহ বিভিন্ন কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে বরিশালের একমাত্র দুগ্ধ ও গবাদিজাত উন্নয়ন খামার। দুই বছর ধরে দুগ্ধ ও গর্ভবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে বাছুর ও দুধ উৎপাদন। খামার কর্তৃপক্ষ বলছে, জনবল সংকটের কারণে খামারটি পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনলেও সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

খামার সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর কাশিপুরে ১৯৯৩ সালে ৩৬ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় খামারটি। চারটি মিল্ক শেড, পাঁচটি ড্রাই শেড, একটি বুর শেড ও একটি আইসোলেশন সেন্টারসহ ১১টি শেড নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এর বাইরে অফিস ভবন ও আবাসিক ভবন রয়েছে। বাকি ২৬ একর জমিতে ঘাস চাষ হয়। উৎপাদিত ঘাসেই গবাদিপশুর খাদ্যের জোগান হয়। তবে খামার প্রতিষ্ঠার সময়ে নির্মিত ১১টি শেডই বারবার সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। শেডগুলো নতুন করে নির্মাণ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনগুলোর অধিকাংশই এখন পরিত্যক্ত।

বরিশালের দুগ্ধ ও গবাদিজাত উন্নয়ন খামারের উপপরিচালক আনিছ উজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ খামার থেকে উৎপাদিত এঁড়ে বাছুরগুলো সাভারে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেগুলো থেকে সিমেন সংগ্রহ করা হয়, যা দেশের বিভিন্ন প্রজনন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। একেকটি এঁড়ে বাছুর থেকে চার লাখ ডোজ সিমেন উৎপাদন সম্ভব। আমাদের উৎপাদিত পুরুষ বাছুর থেকে বছরে কোটি টাকা আয় সম্ভব। তবে খামারে জনবল ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট রয়েছে। এর মধ্যেও খামার থেকে দুধ, গবাদিজাত পশু উৎপাদন বাড়ানো ও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

খামার সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন মেয়াদ শেষ হলে অনিশ্চয়তায় পড়ে পুরো প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যদিও তৎকালীন সরকার এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে নিয়ে নেয়। এর পরই ঘুরে দাঁড়ায় খামারটি। ২০২১ সাল থেকে খামারে দুগ্ধবতী ও গর্ভবর্তী গাভীর লক্ষ্যমাত্র অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে খামারে দুগ্ধবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০টি। কিন্তু অর্জন হয়েছে ৪৮টি। গর্ভবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০টি। অর্জন হয়েছে ৪০টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কেন্দ্রীয় খামার থেকে দেয়া গর্ভবতী গাভী। যা দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫০টি। অর্জন হয়েছে ৫৬টি। এর মধ্যে বকনা বাছুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬টি। অর্জন হয়েছে ৯৭টি। এঁড়ে বাছুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫টি। অর্জনও হয়েছে ২৫টি। এছাড়া দুধ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৮০০ লিটার। আর অর্জন হয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৪৪ লিটার। ঘাস উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ টন। অর্জন হয়েছে ২১ দশমিক ৪৫ টন।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দুগ্ধবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০টি। অর্জন হয়েছে ৫১টি। গর্ভবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০টি। অর্জন হয়েছে ৩৭টি। এ বছরও কেন্দ্রীয় খামার থেকে পাঠানো হয় গর্ভবতী গাভী, যা দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫০টি। অর্জন হয়েছে ৯৬টি। এর মধ্যে বকনা বাছুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬টি। অর্জন হয়েছে ৯৭টি। এঁড়ে বাছুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫টি, অর্জন হয়েছে ৩৩টি। আর দুধ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার লিটার। অর্জন হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৪১ লিটার। ঘাস উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ টন, অর্জন হয়েছে ২৬ টন।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুগ্ধবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০টি। আর গর্ভবতী গাভীর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০টি। দুধ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার ৫০০ লিটার। বাচ্চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪০টি। এর মধ্যে বকনা ৫০ ও এঁড়ে বাছুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬টি। ঘাস উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ টন।

এদিকে খামারটিতে থেরিওজেনোলজিস্ট, অ্যানিমেল প্রডাকশন অফিসার ও উচ্চমান সহকারী-কাম হিসাব রক্ষকের একটি করে পদ থাকলেও দীর্ঘদিন তা শূন্য। এছাড়া ভেটেরিনারি কম্পাউন্ডারের দুটি পদ থাকলেও কর্মরত রয়েছেন একজন। মাঠকর্মীর দুটি পদের মধ্যে একটি শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন। অন্যজন ডেপুটেশনে রয়েছেন অন্যত্র। ফলে এ পদে এখানে কর্মরত নেই কেউ। মিল্ক রেকর্ডকিপার দুজনের মধ্যে একজন আছেন, অন্যজন ডেপুটেশনে বগুড়ায় কর্মরত। একজন মাত্র ট্রাক্টরচালকও রয়েছেন ডেপুটেশনে। এছাড়া নিরাপত্তারক্ষীর ছয়টি পদের মধ্যে পাঁচজন কর্মরত থাকলেও একজন ডেপুটেশনেসহ দুটি পদ শূন্য রয়েছে। ট্রাকের হেলপার, মিল্কম্যান কাম বায়ার ক্লিনারের ১২টি পদে কর্মরত আছেন ১০ জন। এর মধ্যে ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন তিন। গ্রাস কাটার ১১টি পদের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন নয়জন। এর মধ্যে তিনজন ডেপুটেশনে রয়েছেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর একটি পদের একটিই শূন্য রয়েছে।

স্থানীয় সুবিধাভোগী আবুল হোসেন জানান, আগে খামার থেকে এ অঞ্চলের মানুষের আমিষের চাহিদা মেটাতে গরু বিক্রি হতো। এখন রোজা এলেই বিক্রিযোগ্য গরুগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় ভাণ্ডারে। ফলে বরিশালের মানুষ এখন দুধ ছাড়া কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না এ খামার থেকে।

আরও