কারাগারে ভোট দেবেন দীপু মনি-ইনু-মেননসহ বাহিনীর দাপুটে সাবেক কর্মকর্তারা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কারাগারে বা আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি গণভোটেও অংশ নিতে পারবেন তারা। জুলাই আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও, দলটির কারাগারে থাকা একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। এছাড়া ১৪ দলীয় জোটের দুটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা, যারা সাবেক মন্ত্রী, তারাও ভোট দেবেন।

নিবন্ধন করা সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন— দীপু মনি, আসাদুজ্জামান নূর, শাজাহান খান, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন ও এনামুর রহমান।

শুধু মন্ত্রী কিংবা এমপিরাই নয়, আওয়ামী লীগ আমলে দাপুটে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের সাবেক ডিজি জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া ও সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম নিবন্ধন করেছেন।

এছাড়া সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু সুর চৌধুরীও আছেন নিবন্ধন করা বন্দিদের তালিকায়। সাবেক সচিবদের মধ্যে আছেন মো. শাহ কামাল, মেজবাহ উদ্দিন, মোস্তফা কামাল উদ্দিন, হেলালুদ্দীন আহমেদ, এনএম জিয়াউল আলমের নাম রয়েছে নিবন্ধনের তালিকায়।

কারা অধিদপ্তর সূত্র বলছে, দেশের ৭২টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৮৭ হাজারের কাছাকাছি। ভোট দেয়ার জন্য এদের মধ্যে নিবন্ধন করেছেন ৬ হাজার ৩৬৩ জন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে সাত জন আগ্রহ দেখিয়েছেন ভোটে।

আবার ৪১৩টি নিবন্ধন আবেদন নাকচ করেছে নির্বাচন কমিশন। ফলে ৮৭ হাজার বন্দি থাকলেও ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ৫ হাজার ৯৬০ জন। এদের মধ্যে আবার প্রায় ৩০০ জন নিবন্ধন করার পর জামিনে বাইরে আছেন। পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করলে সরাসরি ভোট দেয়া যায় না বলে তারাও ভোট দিতে পারছেন না।

কারাগারের সাত বিভাগ এবং ঢাকার দুই বিভাগসহ মোট ৯ বিভাগ থেকে সারাদেশে ৪ হাজার ১১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিবন্ধন করেছেন।

কারাগারে যে কারণে বন্দিদের ভোটে আগ্রহ কম

কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, অর্ধেকের মতো বন্দির জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি নেই। এনআইডি কার্ড সঙ্গে না থাকায় নিবন্ধন করতে পারেনি। এ কর্মকর্তার ভাষ্য, যারা কার্ডের নম্বর জানেন তাদের অনেকে নিবন্ধন করতে চান না নিজেদের আড়াল করে রাখতে। অনেকে মনে করেন, কারাগারে ভোট দেয়া মানে নির্বাচন কমিশনের অফিসে তথ্য চলে যাওয়া। তারা গোপনেই থাকতে চান, প্রকাশ্যে আসতে চান না।

তৃতীয় যে কারণ তার কথায় উঠে এসেছে সেটি হলো— কারাগার থেকে যারা ভোটের জন্য নিবন্ধন করবেন তারা জামিন হলে বাইরে গিয়ে আর ভোট দিতে পারবেন না। ভোট দিতে হলে আবার কারাগারে ঢুকতে হবে। আসামিদের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ সাজাপ্রাপ্ত, তারাও ভাবে জামিনে যাবে। এই জামিনে যাওয়ার চিন্তা থেকে তারা নিবন্ধন করেননি।

অন্যদিকে জামিনে বের হওয়া একজন আসামি জানান, কারাগারে বন্দিদের মধ্যে বড় অংশই এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। যেহেতু দলটি এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না, তাই তাদেরও ভোটে আগ্রহ কম।

মন্ত্রী-এমপিসহ ৪৯ ভিআইপির নিবন্ধন

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা নিবন্ধনে অনাগ্রহ দেখালেও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপিরা নিবন্ধন করেছেন। সাবেক সরকারের প্রশাসনে উচ্চপদে থাকা সচিবদেরও অনেকের নামে নিবন্ধন হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৫ জন এমপি-মন্ত্রীসহ ৪৯ জন ভিআইপি বন্দি ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন।

নিবন্ধন করা সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা হলেন— দীপু মনি, আসাদুজ্জামান নূর, ইমরান আহমদ, শাজাহান খান, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, সাংসদ মো. আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, এনামুর রহমান ও শাহজাহান ওমর।

সাবেক সংসদ সদস্যরা হলেন— শাহে আলম, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, সাদেক খান, আব্দুল মজিদ খান, সিরাজুল ইসলাম মোল্যা, রইস উদ্দিন, আমিরুল আলম মিলন, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামুদ্দীন, রহিম উল্লাহ, আ ক ম সরোয়ার জাহান, মো. নবী নেওয়াজ, আব্দুল আজিজ, সাদ্দাম হোসেন পাভেল, মো. ফয়জুর রহমান বাদল ও মো. চয়ন ইসলাম।

এ তালিয়ায় আরো আছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু সুর চৌধুরী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের সাবেক ডিজি জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক ডিআইজি মোল্যা নজরুল ইসলাম ও এ কে এন নাহিদুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শহিদুল্লাহ, সাবেক পুলিশ সুপার মো. মহিউদ্দিন ফারুকী ও আব্দুল মান্নান, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিন, শাহ মো. মশিউর রহমান,ইশতিয়াক আহম্মেদ ও অনির্বাণ চৌধুরীও নিবন্ধন করেছেন।

সাবেক সচিবদের মধ্যে আছেন মো. শাহ কামাল, মেজবাহ উদ্দিন, মোস্তফা কামাল উদ্দিন, হেলালুদ্দীন আহমেদ, এনএম জিয়াউল আলম।

পোস্টাল ব্যালটে ভোট কবে, কীভাবে

কারাগারগুলোতে ব্যালট পেপার আসা শুরু হয়েছে জানিয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, ৩, ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি চলবে ভোটের কার্যক্রম। এ তিনদিনে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট দেয়া যাবে। নিবন্ধন যারা করেছেন তারা প্রত্যেকে একটি প্যাকেটে তিনটি করে খাম পাবেন। প্যাকেটে নির্দেশাবলীসহ একটি খামে থাকবে ব্যালট পেপার, অপর খামে থাকবে 'হ্যাঁ' অথবা 'না' ভোটের ব্যালট পেপার। বড় একটি খামে এই দুই ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে আঠা লাগিয়ে দিতে হবে। এই আঠা লাগানোর পর খাম ছেড়া ছাড়া খোলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন বন্দিরা। কারা কর্তৃপক্ষ সেগুলো পোস্ট অফিসে পাঠাবেন। ডাক বিভাগ এক্সপ্রেস ব্যবস্থায় খামগুলো নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। এরপর নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় জমা পড়া ভোটের সংখ্যা যুক্ত করবে।

নিবন্ধন আবেদন বাতিলের বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, সঠিক তথ্য না দেয়ার কারণে এটি হয়েছে। একাধিক এনআইডি, এনআইডিতে ভুলসহ একাধিক কারণেও নিবন্ধন বাতিল হয়েছে।

আরও