কেএইচআইয়ের প্রতিবেদন

জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশে প্রতি বছর ক্ষতি ২০৭০ কোটি ডলার

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০-এর দশকের তুলনায় চলতি দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এতে ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপ বের করে দেয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়

বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বছরে ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৭০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, অকালমৃত্যু এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাব্যয় হিসাব করে এ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের (কেএইচআই) এক নতুন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও তা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি ও সরকারি অর্থায়ন প্রয়োজনের তুলনায় কম।

রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আজ ‘মাল্টি-ডাইমেনশনাল হেলথ ইমপ্যাক্টস অব ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ: পাথওয়েজ, কস্টস অ্যান্ড পলিসি ইমপ্লিকেশনস’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০-এর দশকের তুলনায় চলতি দশকে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এতে ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপ বের করে দেয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। একইসঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

অতিরিক্ত গরম হৃদযন্ত্র ও কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে শারীরিক পরিশ্রম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন রোগের আশঙ্কা বাড়ে। বন্যা ও দূষিত পানি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে এবং চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করে। রোগের প্রাদুর্ভাবে চিকিৎসাব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের আয়ও কমে যায়।

কেএইচআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বছরে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, তা ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। কর্মক্ষমতা হ্রাস, অকালমৃত্যু ও কয়েকটি রোগের চিকিৎসাব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে। তবে এতে বায়ুদূষণ এবং প্রাণঘাতী নয়, এমন অসুস্থতার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে।

গবেষণায় তাপপ্রবাহ, মশাবাহিত ও পানিবাহিত রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব, অর্থনৈতিক ক্ষতি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির সামগ্রিক ক্ষতির মধ্যে বছরে প্রায় ১০০ কোটি থেকে ৩৩০ কোটি ডলার সরাসরি তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।

কেএইচআইয়ের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শুধু ২০২৪ সালেই অতিরিক্ত তাপের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কোটি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য, দুই ক্ষেত্রেই এ ক্ষতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত গরমের কারণে হারানো কর্মঘণ্টার আর্থিক মূল্য ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার। তীব্র গরমে শারীরিক শ্রমের ঝুঁকি বাড়ায় যে কর্মক্ষমতা কমে যায়, তার ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। হারানো কর্মঘণ্টার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা। নির্মাণশ্রমিকসহ শারীরিক পরিশ্রমনির্ভর অন্যান্য পেশার মানুষও এ ঝুঁকিতে রয়েছেন। এতে তাদের স্বাস্থ্য ও আয় দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তার মতে, তাপ থেকে সুরক্ষায় বিভিন্ন খাতের জন্য নির্দেশিকা তৈরি, জেলা পর্যায়ে তাপ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের আরো কার্যকর ব্যবহার জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি কপ-৩১ সম্মেলনসহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনাতেও বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্নভাবে এবং পরস্পর সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার, গবেষণা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। শক্তিশালী গবেষণালব্ধ প্রমাণ বাংলাদেশকে কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও বাড়তি জলবায়ু অর্থায়নের পক্ষে জোরালো দাবি তুলতে সহায়তা করবে। গবেষণার ফলাফলকে বাস্তবসম্মত ও সমন্বিত পদক্ষেপে রূপান্তর করাই এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

আরও