উপজেলার বদরপুর ও মৌকরণ ইউনিয়নের ২০ হেক্টর জলাশয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্প বিলুপ্তপ্রায় মাছ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে মৎস্য শিকার নিষিদ্ধ হওয়ায় স্থানীয় জেলেদের বিকল্প জীবিকা হিসেবে বাছুর দেয়ায় তাদের টেকসই পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের (মৎস্য অধিদপ্তর অংশ) আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার বদরপুর ও মৌকরণ ইউনিয়নে দুটি খালে মোট ২০ হেক্টর জলাশয়জুড়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এর মধ্যে দুটি অভয়াশ্রমের আয়তন এক হেক্টর করে মোট দুই হেক্টর। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে পটুয়াখালী সদরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়।
প্রকল্পের শুরুতে অভয়াশ্রমে রুই, কাতল, আইড়, শোল, বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশী প্রজাতির মাছ অবমুক্ত করা হয়। বর্তমানে এসব মাছের অধিকাংশই পরিপক্ব হয়েছে এবং অনেক মাছের ওজন দুই থেকে সাড়ে তিন কেজি পর্যন্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্য গ্রহণ করে মাছগুলো বড় হওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশে বংশবিস্তার করছে, যা স্থানীয় জলাশয়ে দেশী মাছের সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত একবার সংস্কার করা হয়েছে। এরপর নিয়মিত পাহারা ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় অভয়াশ্রমটি সংরক্ষিত রয়েছে।
অভয়াশ্রমের পাহারাদার মো. দুলাল হোসেন বলেন, ‘তেলিখালী অভয়াশ্রমে প্রায় এক হেক্টর এলাকায় পাঁচটি নিরাপদ মাছের আশ্রয়স্থল রয়েছে। সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ অবমুক্ত করা হয়েছিল। এখন অনেক মাছের ওজন দুই কেজির বেশি হয়েছে। এসব মাছ নিয়মিত বংশবিস্তার করছে। সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, এলাকাবাসী অত্যন্ত সচেতন। কেউ অভয়াশ্রমে মাছ শিকার করতে আসে না।’
অভয়াশ্রমের কারণে খালের দুই পাড়ের জেলেরা বিকল্প জীবিকার পথ বেছে নিয়েছেন। সরকার তাদের পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ জন উপকারভোগীকে একটি করে বাছুর দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি বাছুরের বাজারমূল্য প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা তাদের আয়বর্ধক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
উপকারভোগী মো. ফারুক হাওলাদার বলেন, ‘তেলিখালী খালের পাড়ে আমার বাড়ি। আগে এ খালেই মাছ ধরে সংসার চালাতাম। অভয়াশ্রম হওয়ার পর আমাদের সমিতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। আমরা অভয়াশ্রম রক্ষায় সহযোগিতা করছি। সরকার আমাদের ১০ জনকে গরু দিয়েছে, যা এখন আমাদের পরিবারের আয়ের একটি বড় অবলম্বন।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তপন মজুমদার বলেন, ‘মৎস্য অভয়াশ্রম বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ই উপকৃত হচ্ছে। সরকার খাল খনন ও দেশী মাছ সংরক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এ অভয়াশ্রম। এখানে মাছ নিরাপদে বড় হচ্ছে ও বংশবিস্তার করছে। অভয়াশ্রমের বাইরে ছড়িয়ে পড়া মাছ স্থানীয় জেলেরা আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এ ধরনের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা সম্ভব হলে দেশী মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা যাবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, মৎস্য অভয়াশ্রম শুধু মাছ সংরক্ষণের প্রকল্প নয়; এটি জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার একটি কার্যকর ব্যবস্থা। নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র নিশ্চিত হওয়ায় দেশী মাছের সংখ্যা বাড়ে, জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদের আয়ও বাড়ে। একই সঙ্গে বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে আসে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ ধরনের অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরো বাড়ানো হলে বিলুপ্তপ্রায় দেশী মাছ সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশের মৎস্যসম্পদ সমৃদ্ধ হবে। এছাড়া জেলেদের টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করার পথ আরো সুদৃঢ় হবে।