দাম বাড়ছে কয়লার খরচ বাড়বে বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মূল্যবৃদ্ধির পর কয়লার দামও বাড়তে শুরু করেছে।

বতর্মানে ইন্দোনেশিয়ান কোল ইনডেক্স অনুযায়ী, টনপ্রতি কয়লার দাম ৭৩ ডলারের কাছাকাছি, যা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার আগে ছিল ৬৭ ডলার। অর্থাৎ গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে এ কয়লার প্রায় ৯ শতাংশ দাম বেড়েছে। পাশাপাশি জাহাজের ফ্রেইট বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। সেই সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী জাহাজের প্রিমিয়াম চার্জও। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ২৬ শতাংশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে মূলত আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে এ বড় সক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি কয়লার ব্যবহার বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বেশির ভাগই কয়লা আমদানি হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। বর্তমানে দেশে চলমান আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য ৫ হাজার কিলোক্যালরি মানের কয়লা ব্যবহার হয়। এ কয়লার দাম ইন্দোনেশিয়ার প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, টনপ্রতি ৭২ ডলার (আইসিআই-৩ অনুসারে জিএআর ৫ হাজার কিলোক্যালরি মান), যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল টনপ্রতি ৬৭ ডলার। আর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর আগে ইন্দোনেশিয়ার একই মানের কয়লার দাম ছিল ৬৭ দশমিক ৬০ ডলার। দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়ার প্রাইস ইনডেক্স নিম্নমুখী থাকলেও গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তা বাড়তে শুরু করেছে। মূলত আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে ভাড়া বৃদ্ধি ও প্রিমিয়াম চার্জ বেড়ে যাওয়ায় এ কয়লা দেশে আনতে টনপ্রতি ব্যয় ৯০-৯৫ ডলারের কাছাকাছি পড়ছে।

অন্যদিকে, ফিউচার মার্কেটে অস্ট্রেলিয়ার নিউ ক্যাসল প্রাইস ইনডেক্সে কয়লার দাম বেড়েছে টনপ্রতি ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল প্রাইস অনুযায়ী, কয়লার টনপ্রতি মূল্য ছিল ১০৯ ডলার, সেখানে গতকাল এ দাম ১৩১ ডলার ৭৫ সেন্টে স্থিত হয়। অর্থাৎ গত দেড় মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি এ কয়লার দাম বেড়েছে ২২ ডলার।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৭ শতাংশ। দেশে গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ ব্যয় হচ্ছে ইউনিটপ্রতি গড়ে সাড়ে ১১ টাকার মতো। সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট কয়লা মজুদ রয়েছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার টন। যার মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য স্থানীয় খনির মজুদ ১ লাখ ১৬ হাজার টন।

দেশে বর্তমানে দৈনিক সাড়ে ১২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। যেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ভারতের আদানিসহ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের সরবরাহ ধরলে গড়ে তা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হয়। দেশে এলএনজি ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপরে চাপ কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। সামনের দিনে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো কীভাবে চালু রাখা যায় তা নিয়েও বিপিডিবির পরিকল্পনা রয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক চালু রাখার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোর কয়লা মজুদের নির্দেশনাও দেয়া হয়। এখনো সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো জটিলতা দেখা যাচ্ছে না। তবে জ্বালানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় কয়লার দাম বাড়তে থাকলে তা বিদ্যুতের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিপিডিবির তথ্যে দেখা গেছে, পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা মজুদ রয়েছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার টন (৬১ দিনের, ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু থাকলে), রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার মজুদ রয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টন (৩৯ দিনের), মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লার মজুদ রয়েছে ৮৭ হাজার ৯১৭ টন (১০ দিনের), বাঁশখালী এসএস পাওয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুদ রয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টন (৪২ দিন), বরিশাল ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ৫৬ হাজার টন কয়লা মজুদ রয়েছে। পটুয়াখালী আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মজুদ রয়েছে ৩৫ হাজার টন (কয়লার টেন্ডার নিয়ে কার্যক্রম চলমান) আর দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য মজুদ রয়েছে ৬ লাখ ১৫ হাজার টন।

মধপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজি নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন দেশে কয়লার ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে কয়লা সরবরাহ হয় তা মূলত আমদানিনির্ভর। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে কয়লার দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে জ্বালানির সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কয়লার দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণ মূলত এলএনজি। বিশ্বব্যাপী এলএনজি দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে বহু দেশ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু ও উৎপাদন বাড়িয়েছে। এতে কয়লার বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, ফলে দামও বাড়ছে। বাংলাদেশ আমদানি কয়লায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে কয়লাবিদ্যুতের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে।’

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গুস মিডিয়া বলছে, মার্চে বাংলাদেশে মোট কয়লা আমদানি প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১৫ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সাধারণত ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি করে, তবে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকেও কিছু কয়লা কেনা হয়েছে। এ মাসে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৮ হাজার টন ইন্দোনেশীয় এবং ৫৫ হাজার টন দক্ষিণ আফ্রিকান কয়লা দেশে পৌঁছেছে। মার্চের বাকি সময়ে আরো প্রায় ৮ লাখ ৩৭ হাজার টন ইন্দোনেশীয় কয়লা আসার কথা রয়েছে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানি করা ইন্দোনেশিয়ায় কয়লার দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এখনো কয়লার দাম খুব বেশি না বাড়লেও জাহাজ ভাড়া, প্রিমিয়াম চার্জ অধিক হারে বেড়ে গেছে। এমনকি কয়লা আমদানিতে জাহাজও খুব কম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তারা।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইন্দোনেশিয়ার কয়লার দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে কয়লা আমদানিতে জাহাজের ফ্রেইট অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এক মাস আগে টনপ্রতি জাহাজের ফ্রেইট ছিল ১৫ ডলার, তা এখন ২১ ডলারে দরকষাকষি করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রিমিয়াম যুক্ত করলে কয়লার দাম বাড়বে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার প্রভাব রয়েছে।’

এশিয়াজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ মার্চে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কয়লা আমদানি বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স। এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, পাকিস্তানও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। দেশটির বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছেন, এলএনজি-নির্ভরতা কমলে স্থানীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অফ-পিক সময়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফিলিপাইন কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং এলএনজি-নির্ভরতা কমাচ্ছে। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ভিয়েতনাম ইলেকট্রিসিটি কয়লা সরবরাহ নিয়ে আলোচনা করছে। থাইল্যান্ডও তার বৃহত্তম কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়াচ্ছে, যাতে এলএনজি সাশ্রয় করা যায়। পূর্ব এশিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমা তুলে দেয়ার পরিকল্পনা করছে এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ বাড়াতে চায়। জাপানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেরা জানিয়েছে, তারা উচ্চমাত্রায় কয়লাভিত্তিক উৎপাদন অব্যাহত রাখবে।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ও কয়লা আমদানির বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়লার দাম বিশ্ববাজারে ওই অর্থে এখনো বাড়েনি। তবে জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম অনেক বেড়েছে। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে ঈদের পরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করব। এরপর সিদ্ধান্ত নেব। গ্রীষ্ম ও সেচের কথা বিবেচনা করে আগেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে মজুদ (কয়লা) বাড়ানোর কথা জানিয়েছিলাম। তারা মজুদ বাড়িয়েছে। তবে আরো দুই-একটি কেন্দ্রে মজুদ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপিডিবি আরো ভালো অবস্থানে থাকত।’

আরও