পৌরসভা থেকে ২০১২ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় রংপুর। ২০৫ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরীতে ওয়ার্ড রয়েছে ৩৩টি। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর জনবসতি, মানুষের নিয়মিত যাওয়া-আসা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে। তবে সে অনুপাতে গড়ে ওঠেনি সড়ক অবকাঠামো। নতুন ও পুরনো মিলিয়ে দেশের দশম এ সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ৭৩৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। যার মধ্যে ৭৫০ কিলোমিটারই কাঁচা। এছাড়া বেশকিছু ওয়ার্ডে এখনো গড়ে ওঠেনি টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট নূরপুর সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সবসময় ভিড় লেগে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট রোকেয়া বেগম রুকু বলেন, ‘বহুবার বলার পরও সংস্কার হয়নি। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার এক যুগেও সড়কটি সংস্কার না হওয়া দুঃখজনক।’
নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা জাহাজ কোম্পানি মোড়। জিএল রায় রোড থেকে সাতমাথা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। এছাড়া ঘোড়াপীর মাজার থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত এবং ফুলালের মোড় থেকে ময়নাকুঠি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কটিও জরাজীর্ণ। দর্শনা, তপোধন, তামপাট, পরশুরাম, ইটাকুমারি ও দেওতির আংশিক নিয়ে বর্ধিত ওয়ার্ড গঠন হয়। এর মধ্যে ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখনো কাঁচা। এসব ওয়ার্ডে শতকরা ৭৫ শতাংশ ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজম আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রংপুরে সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৭৩৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক ৭৫০ কিলোমিটার। এছাড়া প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশস্তকরণ প্রয়োজন। এছাড়া প্রায় ২৫০ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন এবং ছোট-বড় প্রায় ৩০টি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।’
এদিকে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উন্নয়নে ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রকল্পটি পাস তো দূরের কথা, বিষয়টি নিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ওঠার কথা ছিল। তার আগেই সেটি আপাত বন্ধ রেখেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে ছিল রাস্তা প্রশস্তকরণ ও সংস্কার, আরসিসি রাস্তা নির্মাণ, আরসিসি ড্রেন প্রশস্তকরণ ও ২৩টি সেতু নির্মাণ।
এ বিষয়ে রসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আজম আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উন্নয়নে ১ হাজার ৬৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ডিপিপি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে নতুন কোনো প্রকল্প চালু নেই।’
দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হওয়া রসিকের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ থাকায় নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে সর্বশেষ জাতীয় বাজেটে রসিকের উন্নয়নে বরাদ্দ না রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
নগরীর ধাপ এলাকার বাসিন্দা সহিদুল ইসলাম বাবলু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে নগরীর জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। আবার বিলাসী প্রকল্প নয়, রসিকের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হওয়া দুঃখজনক। নাগরিক সেবা ব্যাহত হলে অসন্তোষ দেখা দেবে। এটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের ওপর।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাইফুদ্দীন খালেদ বলেন, ‘রংপুর দীর্ঘকাল ধরে উন্নয়নের দিক থেকে বৈষম্যের শিকার। সেই ধারাবাহিকতায় উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ থাকা বৈষম্যকে সুস্পষ্ট করেছে। সর্বশেষ জাতীয় বাজেটে রসিকের উন্নয়নে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি যা এ অঞ্চলের প্রতি উন্নয়ন বৈষম্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। পরিবর্তিত বাস্তবতায়ও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত না হওয়ায় রংপুরের জনগণ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাতিল করলেও সড়ক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। যদি রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে। পাশাপাশি উন্নয়ন বাজেটের সুষম বণ্টনও নিশ্চিত করা উচিত। উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়া গেলেই কেবল পিছিয়ে থাকা রংপুরের অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব।’
রংপুর পৌরসভা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ১৮৬৯ সালের ১ মে। ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রথম শ্রেণীর পৌরসভায় উন্নীত হয়। ২০৫ দশমিক ৭০ কিলোমিটার আয়তনের রংপুর শহরকে ২০১২ সালে ২৮ জুন সিটি করপোরেশন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প আপাত বন্ধ রাখার বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। তাই বিষয়টি এখনো আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি।’ তবে রংপুরের উন্নয়নের স্বার্থে যা যা করণীয়, তা অবশ্যই করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।