বিপরীতে কেন্দ্রটি আয় করে ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনার্জি চার্জ (জ্বালানি ও আনুষঙ্গিক) হিসেবে পায় ২ হাজার ১৪২ কোটি টাকা, আর ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে আসে ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ওই অর্থবছরে যে আয় করেছে তার প্রায় ৬৪ শতাংশই এসেছে ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) পরিচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদনে থাকলে ক্যাপাসিটি চার্জ কোনোভাবেই এত বেশি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই কেন্দ্রটির প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যাচাইসহ আর্থিক নানা অসংগতি খতিয়ে দেখার আহ্বান তাদের। কেননা ক্যাপাসিটি চার্জ এখন বিদ্যুৎ খাতের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নিয়ে শুরু থেকেই রয়েছে বিতর্ক। বিশেষ করে সুন্দরবনের কোলঘেঁষে এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণ পরিবেশকে ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে ফেলবে বলে পরিবেশবাদীদের বড় রকমের আশঙ্কা। সেই সঙ্গে এর অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয়, ব্যবহৃত কয়লার দামসহ নানা বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ভারতকে আর্থিকভাবে সুবিধা দেয়ার অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিপিডিবিকে বেশি দামেই বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। উচ্চমাত্রায় ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে পিডিবি কী পরিমাণ আর্থিকভাবে পঙ্গু হচ্ছে সেটি আমরা দেখেছি। এর পরও রামপালের মতো একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে যাচ্ছে।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া এ প্রকল্প অলাভজনক ও অর্থনৈতিকভাবে অগুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে শুরু থেকেই পরিবেশগত আপত্তি রয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রটির ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক কিছুতেই অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ চুক্তিতে আসলে কী আছে সেটিও আমরা জানি না। এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর্থিকভাবে কোনো সুবিধাই দিচ্ছে না বাংলাদেশকে। তাই আইনি প্রক্রিয়ায় গিয়ে এ কেন্দ্র বাতিলের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
বিআইএফপিসিএলের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গত অর্থবছরে ৩৪৫ কোটি ইউনিট (৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন) বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে আয় করেছে ১৪ টাকা ৮৯ পয়সা। আর প্রতি ইউনিটের বিপরীতে ক্যাপাসিটি চার্জ এসেছে ৯ টাকা ৪৯ পয়সার মতো। সব মিলিয়ে ওই অর্থবছরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই পেয়েছে ৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ওই সময় মোট ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা নিট আয় করে কেন্দ্রটি, যার মধ্যে এনার্জি চার্জ হিসেবে পায় ১ হাজার ৫ কোটি টাকা আর ক্যাপাসিটি চার্জ ১ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।
অর্থবছর শেষ না হওয়ায় রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চলতি অর্থবছরের আর্থিক হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। এ সময় কী পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ কিংবা ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে তারও তাৎক্ষণিক কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে।
বিদ্যুৎ বিক্রি ও ক্যাপাসিটি চার্জের আদর্শিক হিসাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্ল্যাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিপুল বিনিয়োগে কেন্দ্র নির্মাণ করে তাতে চাহিদা অনুযায়ী যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করা যায় কিংবা ক্যাপাসিটি চার্জ অন্য কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে এ কেন্দ্র বসানোর কোনো অর্থই নেই। এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিপিডিবির আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। সে হিসাবে বছরে গড়ে ৯০০ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা। অথচ রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন করছে তার অর্ধেকেরও কম, ৩৪৫ কোটি ইউনিট। ওই কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেছে গত বছরের ১২ মার্চ।
রামপালের মতো একই সক্ষমতা পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের। এটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পায়রা বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে মোট ৭৫৪ কোটি ৯০ লাখ ইউনিট। কোম্পানিটি ওই অর্থবছরে আয় করে ৯ হাজার ৯২২ কোটি টাকা, যার মধ্যে এনার্জি চার্জ থেকে আসে ৪ হাজার ৮৪২ কোটি এবং ক্যাপাসিটি চার্জ ৪ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।
বিসিপিসিএলের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পায়রা প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় করেছে ১৩ টাকা ১৪ পয়সা, যেখানে প্রতি ইউনিটে কোম্পানিটি ক্যাপাসিটি চার্জ পেয়েছে ৬ টাকা ৫৪ পয়সা। পায়রার প্রতি ইউনিট জেনারেশন ব্যয় ১০ টাকা ৪৩ পয়সা।
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির বিপুল সক্ষমতা বিবেচনায় ক্যাপাসিটি চার্জ অনেক বেশি পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে এখানে উৎপাদিত বিদ্যুতের দামও অন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় বেশি। এমনকি নানান ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে কেন্দ্রটি বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। বিশেষ করে এটি চালু হওয়ার পর ২০২৩ সালে যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে সাত দফায় বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘন ঘন বন্ধ হলে সেক্ষেত্রে কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করতে বড় ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রসংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইএফপিসিএল ও বিপিডিবির আয়-ব্যয়ের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। সর্বশেষ বোর্ড মিটিংয়ে এসব মতপার্থক্য নিয়ে নির্দেশনা ও সংশোধনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বিআইএফপিসিএলকে।’
রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি প্রায় সময়ই নানা কারণে বসে থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে বিপুল অংকের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় বলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিডিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। বণিক বার্তাকে তিনি আরো বলেন, ‘কখনো কেন্দ্রের জ্বালানি না থাকার কারণেও বসিয়ে রাখতে হয়। গত অর্থবছরে জ্বালানি সংকটের কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।’
যৌথভাবে নির্মিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সমান অংশীদারত্ব রয়েছে বিপিডিবি ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি)। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (তৎকালীন প্রতি ডলারের বিনিয়ম হার ৮০ টাকা ধরে)। তবে বিআইএফপিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় ২৩ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইকুইটি ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ইসিএ ঋণের অংশ ১৭ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রে স্বাভাবিকের চেয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি হওয়ার প্রধান কারণ মূলত কেন্দ্র বসিয়ে রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো সাধারণত ৮৫ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে সারা বছর কেন্দ্র চলবে এমন শর্তেই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেয়া হয়। সাধারণভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র সার্বক্ষণিক চালু থাকলে এনার্জি কম্পোনেন্টের চেয়ে কোনোভাবেই ক্যাপাসিটি কম্পোনেন্ট বেশি হওয়ার কথা নয়।’
ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ বিনিয়োগে ২০১০ সালে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০১৩ সালে বিআইএফপিসিএল ও বিপিডিবির মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সই হয়। ওই বছরই কেন্দ্রটির জন্য জমি অধিগ্রহণ, জমি ভরাট ও সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় নয় বছর পর ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে।
রামপালের ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে ক্যাপাসিটি চার্জ সম্পৃক্ত। এটি শুধু রামপালের ক্ষেত্রে নয়। তবে ওদের বিদ্যুতের দামটা কয়লাভিত্তিক অন্য কেন্দ্রের চেয়ে বেশি। মাতারবাড়ীতে বিদ্যুতের বেঞ্চমার্ক করা হয়েছে। সেখানে কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। রামপালের বিদ্যুৎ পড়ছে ১৩-১৪ টাকা (ইউনিটপ্রতি)। আমরা এ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ, এনার্জি চার্জসহ নানা বিষয় রিভিউ করছি। এগুলো সংশোধন করা হবে।’