যমুনা নদীবেষ্টিত সিরাজগঞ্জ জেলায় সংসদীয় আসন রয়েছে ছয়টি। তাঁতসমৃদ্ধ এ অঞ্চলের মোট ভোটারের অর্ধেকই নারী। বেড়েছে তরুণ ভোটারও। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার ভোটের মাঠে নেই টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জেলার সবক’টি আসনেই ভাগ বসাতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন জামায়াত প্রার্থীরা। তবে বসে নেই বিএনপিও। মাঠে রয়েছেন দলটির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থী। ভোটের মাঠে অন্যান্য দলের প্রার্থী থাকলেও মূলত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। তবে তরুণ ও নারীরা এবারের নির্বাচনে ভোটের ব্যবধান গড়তে বড় ভূমিকা রাখবেন বলেও ধারণা তাদের।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, ছয়টি আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৮ জন। এর মধ্যে নারী ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ জন। ২০১৮ সালের পরে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে প্রায় ৩৮ শতাংশ তরুণ ভোটার বেড়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ-২ আসনে ৩৬ শতাংশ, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে ৩২ দশমিক ৮৪, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৩৪, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে ৩৭ ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ ভোটার বেড়েছে।
নির্বাচনী এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন প্রার্থীরা। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগদানের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে ৪৯ প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ১৩ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। আপিলে কয়েকজন প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯-এ।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, এবারের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপির উত্থান এবং জামায়াতের শক্ত অবস্থান। তবে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন ছাড়া বাকিগুলোতে এনসিপির প্রার্থী নেই। বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে এনসিপির থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত মেজর মনজুর কাদের। ১১ দলীয় জোটের কারণে আসনটি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে ছেড়ে দিতে হয়েছে এনসিপিকে। শুধু সিরাজগঞ্জ-৫ আসন নয়; সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে এনসিপির প্রার্থী দিলশানা পারুল ও সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে দ্যুতি অরণ্য চৌধুরী প্রীতিও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। জোটের হয়ে এ দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জোটের সমর্থনে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন এসএম সাইফ মোস্তাফিজ।
আসনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কাজিপুর ও সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে সিরাজগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী রয়েছেন ছয়জন। বিএনপির হয়ে ভোটের মাঠে রয়েছেন সেলিম রেজা। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর শাহিনুর আলম, জাতীয় পার্টির জহুরুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের মল্লিকা খাতুন, এবি পার্টির শাব্বির হোসেন তামিম ও নাগরিক ঐক্যের নাজমুস সাকিবও রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
আসনটিতে বরাবরই আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর নতুন করে সুযোগ তৈরি হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের জন্য। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থী থাকলেও তাদের অবস্থান খুব বেশি শক্ত নয়।
বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কাজিপুরের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। নির্মূল হয়েছে দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, জুলুম ও নির্যাতন। নির্বাচন সামনে রেখে কাজিপুরের গ্রামে গ্রামে যাচ্ছি। দফায় দফায় ভোটারদের সঙ্গে বৈঠক করছি, কথা বলছি। ধানের শীষ প্রতীক বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে আমরা আশাবাদী।’
সদরের একাংশ ও কামারখন্দ নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ-২ আসন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের ছয়জন প্রার্থী হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে মাঠে রয়েছেন মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মহিবুল্লাহ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন, গণঅধিকার পরিষদের মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিপি) আনোয়ার হোসেনও রয়েছেন ভোটের মাঠে।
সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ ও তাড়াশ) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির আয়নুল হক, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ, জাতীয় পার্টির ফজলুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ আব্দুর রউফ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইলিয়াস রেজা রবিন। রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪৩ জন।
নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে আয়নুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সামনে থেকে সংগ্রাম করেছি। ১৭টি রাজনৈতিক মামলায় অন্তত ছয়বার কারাবরণ করেছি। দলের দুর্দিনে সঙ্গে ছিলাম, এজন্য দল আমাকে মূল্যায়ন করেছে। জনগণ বিপুল ভোটে বিএনপিকে জয়যুক্ত করবে বলে প্রত্যাশা করছি।’
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে একটি মাত্র উপজেলা; উল্লাপাড়া। আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে বিএনপির হয়ে ভোটে লড়ছেন এম আকবর আলী। এছাড়া জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান, জাতীয় পার্টির হিল্টন প্রামাণিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আব্দুর রহমান ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিপি) আব্দুল হাকিম ভোটারদের কাছে টানতে নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিএনপি প্রার্থী এম আকবর আলী বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে এখন পর্যন্ত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কাজ করে যাচ্ছি। দলের আদর্শ নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি। ভোটে জয়ী হবো বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আমিরুল ইসলাম খান আলিম। জামায়াতের হয়ে লড়ছেন অধ্যক্ষ আলী আলম। এছাড়া জাতীয় পার্টির আকবর হোসেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুরুন নবী, গণঅধিকার পরিষদের ইউসুফ আলী ও সিপিপির মতিয়ার রহমানও ভোটে লড়ছেন।
তাঁতসমৃদ্ধ এ আসনটি বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলা নিয়ে গঠিত। ১৯৮৬-২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে বিএনপি প্রার্থী তিনবার, জাতীয় পার্টি দুবার ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী পাঁচবার নির্বাচিত হয়েছেন।
জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ আলী আলম বলেন, ‘মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। এ পরিবর্তন জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরেই হবে। এ আসনের মানুষ এবার তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে।’
শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনটি গঠিত। বিগত সময়ে একতরফা নির্বাচন বাদ দিলে আসনটি বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে দীর্ঘদিনের এ দুর্গ ভাঙতে চায় জামায়াত। এবারের নির্বাচনে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১০ প্রার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির এমএ মুহিত, জামায়াতের মিজানুর রহমান, এনসিপির এসএম সাইফ মোস্তাফিজ, জাতীয় পার্টির মোক্তার হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মিসবাহ উদ্দিন, আমজনতার দলের আসাদুল হক, এবি পার্টির আবু জাফর মো. আনোয়ারুস সাদাত, জেএসডির ইলোনা খাতুন, বাসদের আনোয়ার হোসেন ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোশারফ হোসেন শহিদুল।
বিএনপি প্রার্থী এমএ মুহিত বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে মাটি ও মানুষের নেতা হয়ে সার্বক্ষণিক পাশে ছিলাম। দল আমাকে মূল্যায়ন করেছে। এ আসন বিএনপি বিপুল ভোটে জয় পাবে।’
তবে প্রচারণে পিছিয়ে নেই জামায়াত। দলটির প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন অধ্যাপক মাওলানা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মানুষ আমাদের ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। জনগণ জামায়াতকেই ভোট দেবে। কেননা ৫ আগস্টের পর জামায়াত কোথাও ভাংচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হয়নি। হাটবাজার ও গ্রামগঞ্জে গণসংযোগ করছি, মানুষের ভালো সাড়াও পাচ্ছি।’