খুলনা শহরের সঙ্গে দিঘলিয়া উপজেলা ও নড়াইল জেলাকে সংযুক্তকারী এ গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ তিন দফা সময় বাড়িয়েও মাত্র ২০ শতাংশ শেষ হয়েছে। ২৮টি পিলারের মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে কেবল ১৭টির। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেড় বছর ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখায় স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কিছু কর্মকর্তার অবহেলা ও অনৈতিক সুবিধা নেয়ার মানসিকতার কারণেই এ স্থবিরতা। তবে সওজ কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, নকশা সংশোধন ও নিরাপত্তার স্বার্থে কাজের গতি কিছুটা মন্থর ছিল। এদিকে কাজ বন্ধ রাখায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে সওজ বিভাগ।
ভৈরব নদের নগরঘাট এলাকায় সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। ২০২১ সালের ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ২৫ নভেম্বরের মধ্যে অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারীসহ নানা অজুহাতে তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। এ পর্যন্ত ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি টাকা।
ভৈরব নদ খুলনা শহর থেকে দিঘলিয়া উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সেতুটি নির্মিত হলে দুই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে স্থানীয়দের প্রতিদিন নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর।
জানা গেছে, অ্যাপ্রোচ সড়কের জন্য নদের দুই পাড়ে সাড়ে ১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। শহরের পাড়ে শিল্প-কারখানা থাকায় জমি বুঝে পেতে প্রথম দিকে কিছুটা সমস্যা হলেও পরে সওজ বিভাগ জমি বুঝে নেয়। তা সত্ত্বেও দেড় বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান,"সবকিছুতেই সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই লাভ। তারা কৌশলে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন। আবার অন্যদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে কৌশলে তাদের সরিয়ে দেন। তারা নকশা পরিবর্তন করেন, বাজেট বাড়ান, সময় বাড়ান। কিছুদিন পর এ সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা বদলি বা অবসরে চলে যান। আর মানুষের ভোগান্তি চলতেই থাকে।"
অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি কারণে নকশা সংশোধন করতে হয়েছে। প্রথম নকশায় নদের মাঝে দুটি পিলার ছিল। নদের মাঝখানে পিলার থাকলে পলি জমে নদ ভরাট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই নকশা সংশোধন করে মাঝের পিলার দুটি তীরে সরিয়ে আনা হচ্ছে। এতে মূল স্টিল সেতুর দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১৫১ মিটার। এছাড়া সড়ক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সেতুর নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল নকশায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন ছিল না। সংশোধিত নকশায় দুই পাশে পৃথক লেন যুক্ত করায় সেতুর প্রশস্ততা দেড় গুণ বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার করা হয়েছে। নগরের মহসিন মোড়ে রেললাইনের ওপর কংক্রিটের গার্ডার পরিবর্তন করে স্টিলের গার্ডার বসানো হচ্ছে।
সওজ সূত্র জানায়, মূল সেতুটি হবে চার লেনের ও নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নদ থেকে এটি প্রায় ৬০ ফুট উঁচুতে পিসি গার্ডার নকশায় নির্মিত হবে। সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য দুই পাশে ৩ কিলোমিটারের বেশি উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা শহর প্রান্তে নগরের মহসিন মোড় পর্যন্ত ১ দশমিক ২৭ কিলোমিটার ও দিঘলিয়া প্রান্তে নদ থেকে উপজেলা মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
মোট বরাদ্দের মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২৮১ কোটি টাকা এবং বাকি টাকা অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় হবে।
সরজমিনে প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে মোবাইল ফোনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক শামীম আহমেদ বলেন, ‘প্রকল্পের পরিবর্ধিত নকশা হাতে না পাওয়ায় কাজের গতি কমেছে। তাছাড়া শুরুতে সময়মতো জমি বুঝে না পাওয়ার কারণে কাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।’"
তবে সওজ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে ডজনখানেক চিঠি দেয়ার পরও ঠিকাদার কাজ করছেন না। এজন্য চুক্তি বাতিলের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। অনুমোদন মিললে প্রকল্পটিতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শেষ করা হবে।’
সওজ বিভাগ খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,"‘আমাদের অধিদপ্তর থেকে এর আগে এত বড় সেতু নির্মাণ করা হয়নি। ফলে শুরুতে কিছু জটিলতা ছিল। এখন বড় সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করছি। ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্পের নকশা ও প্রকল্প সংশোধনের কাজ চলছে। দ্রুত সংশোধিত প্রকল্প উত্থাপন করা হবে।’