সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ফেনীর চার উপজেলায় চারটি সেতু নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২০২১-২৪ সালের মধ্যে এসব সেতুর মূল কাজ শেষ হয়েছে। ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুগুলো নির্মাণ করা হলেও একটিতেও সংযোগ সড়ক নেই। কয়েক বছর আগে মূল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও কাজে আসছে না এসব সেতু।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যাতায়াত সহজ করা, সময় ও ব্যয় কমিয়ে আনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সেতুগুলো নির্মাণ হলেও কোনো কাজেই আসছে না। তবে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা যায়নি। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসব সেতু চলাচলের উপযোগী করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের যেকোনো সেতুই স্থানীয়দের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। সেতুগুলো চালু করতে প্রকৌশল বিভাগ ভূমি অধিগ্রহণের আবেদন করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়ন ও ভোরবাজার সড়কে কালীদাস পাহালিয়া নদীর ওপর ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্য একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। প্রায় বছর খানেক আগে নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক না থাকায় এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একইভাবে দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের বেকের বাজার সড়কে ছোট ফেনী নদীর ওপর ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়। মেসার্স সালেহ আহাম্মদ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। বছর খানেক আগে সেতুর ৭০ শতাংশ কাজ শেষ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলে যায়। এরপর থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করায় স্থানীয়রা পাশে কাঠের সেতু তৈরি করে নিয়েছেন চলাচলের জন্য। একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে দাগনভূঞা উপজেলার সিলোনীয়া নদীর ওপর নির্মিত উত্তর জায়লস্কর-ওমরপুর সেতু। ২০২১ সালে ৮১ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ শুরু করে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালে কাজ শেষ হলেও নির্মাণ করা হয়নি সংযোগ সড়ক। ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নে মুহুরী নদীর ওপর নির্মিত সেতুটিরও একই অবস্থা। ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৯৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না সংযোগ সড়ক না থাকায়।
এলজিইডি কর্তৃপক্ষ বলছে, মাতুভূঞা ইউনিয়নের আশ্রাফপুর-মোমারিজপুর সেতুর কাজ ৩০ শতাংশ বাকি রয়েছে। সিলোনীয়া নদীর ওপর নির্মিত উত্তর জায়লস্কর-ওমরপুর সেতুর কাজ ৯৩ ভাগ শেষ হয়েছে। এছাড়া নবাবপুর-ভোরবাজার সেতু এবং মহামায়া ইউনিয়নের সেতুর কাজও শেষ ভাগে এসে আটকে গেছে। এসব সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়কের জায়গা নেই। ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া সড়ক নির্মাণ করা যাবে না।
সরজমিনে আশ্রাফপুর-মোমারিজপুর সেতু পরিদর্শনে দেখা গেছে, ১০টি পিলারের ওপর সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। সেতুতে ওঠার জন্য দুই পাশে নেই সংযোগ সড়ক। পাশেই বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি সেতু তৈরি করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ধনা মিয়া বলেন, ‘সেতু নির্মাণের সময় আমার দোকান ভেঙে দেয়া হয়। সেতুর কাজ শেষে ঠিকাদারের লোকজন দোকানটি মেরামত করে দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তো কাজ শেষ না করেই চলে গেল। আমার দোকানটি আর মেরামত করা হয়নি। কাঠের সেতুতে চলাচল করতে গিয়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ। অথচ পাশেই পড়ে রয়েছে কোটি টাকার সেতু।’
ছাগলনাইয়ার মহামায়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন অভিযোগ করেন, মুহুরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণে পরিকল্পনার অভাব ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ছিল। যদি তাই না হবে, তাহলে ৮ কোটি টাকার সেতু নির্মাণে সংযোগ সড়কের পরিকল্পনা বাদ যায় কীভাবে। মূলত একবার সেতুর জন্য লুটপাট, আরেকবার সংযোগ সড়কের কথা বলে লুটপাটের পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিল সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক বিষয়ে এলজিইডি ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ আল-ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত সেতুর দুই পাড়ের বাসিন্দারা সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য জায়গা দিতে রাজি হচ্ছেন না। এজন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এরই মধ্যে অধিগ্রহণের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে অধিগ্রহণ শেষে দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে।’ আগামী বছরের জুনের মধ্যেই সেতুগুলো চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।