টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলার পাছ চারান গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষী জলাভূমি চারান বিল। টাঙ্গাইল এলাকার ২৭৭টি বিলের মধ্যে অন্যতম এ মৎস্য অভয়াশ্রম ভরাট, দখল, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্প বর্জ্যের কারণে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে বিলুপ্ত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী শাপলা-শালুক, দেশীয় মাছ ও মাছ ধরার পুরনো পদ্ধতি। বছরের নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও সে আইন মানা হচ্ছে না। প্রতিদিনই ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার চায়না দোয়ারী পাতা হয় চারান বিলে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। আগের মতো মাছ না থাকা সত্ত্বেও এখনো শত শত মানুষ এ বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিলে দুটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি আছে, কার্ডধারী মৎস্যজীবীর সংখ্যা প্রায় ২৩০। কার্ডধারী ছাড়াও আশপাশের কয়েকশ পরিবার মাছ শিকার ও চারান বিলকেন্দ্রিক কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
একসময় এই বিলে ইলিশসহ বাতাসি, রিটা, বেতরঙ্গি, নুন্দাই, চিংড়ি, বাইম, বোয়াল, রুই, কাতল, কালকুনি, গজার, মাগুর, শিং, কৈ, চিতল, মৃগেল, আইড়, চ্যালা, দাইতা পুঁটি, মলা ইত্যাদি দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এর মধ্যে অধিকাংশ প্রজাতির মাছই আর পাওয়া যায় না। পাশাপাশি প্রতি বছরই কমছে চারান বিলে পাওয়া মাছের প্রজাতি।
একসময় চারান বিল ছিল যমুনা নদীর প্রবেশদ্বার। তখন এর পরিধি ছিল কয়েক কিলোমিটার। বর্তমানে তা ১২০ বিঘায় নেমে এসেছে। তাও পুরোটা বর্ষায় প্লাবিত হয় না। স্থানীয় জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগে ছয় মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন নিষিদ্ধ সময়েও সবাই মাছ ধরে। নিষিদ্ধ মৌসুমে সরকারি প্রণোদনা না থাকায় জেলেরা বাধ্য হন সারা বছর মাছ ধরতে। ফলে দিন দিন চায়না দোয়ারীর পরিমাণ বাড়ছে।
স্থানীয় জেলে কবীর বলেন, ‘আমরা জানি, প্রায় পাঁচ মাইলজুড়ে চারান বিলের বিস্তৃতি। আগে বাতাসি, রিটা, বেতরঙ্গি, নুন্দাই, চিংড়ি, বাইম, বোয়াল, কাতল, কালকুনি, গজার, মাগুর, শিং, কৈ, চিতল, মৃগেল, আইড়, দাইতা পুঁটি, মলা— এমনকি মাঝে মাঝে ইলিশও ধরতাম। এখন এত মাছ নেই। বিলে যে পরিমাণ চায়না জাল হয়েছে, তাতে মাছ ছোট থাকতেই ধরা পড়ে। চায়না জাল বন্ধ না করলে সামনে কোনো মাছই থাকবে না।’
এই জেলে আরো বলেন, ‘পাশের বল্লা গ্রামের তাঁত শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্যও বিলে পড়ে। এর ফলে বিলে মাছের থাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া প্রায় পাঁচশ নৌকা নিয়ে পর্যটকরা ঘুরে নানা আবর্জনা ফেলেন, এটিও সমস্যার সৃষ্টি করছে।’
সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ২০১৪-১৫ সালে এখানে ‘ইকোলজি ফর লাইফ’ প্রকল্প চালু করে পাখি পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশগত অবস্থা নিয়ে কাজ করেছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এছাড়া জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও অন্যান্য সংস্থার প্রকল্পগুলোও কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শতবর্ষী এ বিল একসময় স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল ছিল। বর্ষায় মাছ ধরার দৃশ্য, নৌকাবাইচ, শাপলা-শালুক আর পাখির কলরব মিলে ছিল এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। এখন দখল ও দূষণে বিলটি হুমকির মুখে। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মাছের অভয়ারণ্য নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে এ জলাভূমি। বিলে খনন করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা গেলে এটি আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি বিলের আশপাশের পরিবেশকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলারও সম্ভাবনা রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, ‘মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। এজন্য জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির বড় কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড। শিল্পবর্জ্য পানিকে বিষাক্ত করছে, খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস হচ্ছে, ফলে মাছ ও জলজ প্রাণী কমে যাচ্ছে। প্রচলিত আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা তৈরি করে প্রাণীর বিলুপ্তি ও দূষণ রোধ করা সম্ভব এবং এখনই তা করা উচিত।’
কালিহাতী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আইয়ুব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিষিদ্ধ চায়না জাল, বেড় জাল, কারেন্ট জালসহ বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে অতিমাত্রায় আহরণের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছ কমছে। ধীবর মৎস্যজীবী সমিতির নামে চারান বিলটি লিজ দেয়া হয়েছে। সরকারি চুক্তি অনুযায়ী তারাই বিল ব্যবস্থাপনা করে থাকে। মৎস্য অফিসসহ উপজেলা প্রশাসন ও থানার সহযোগিতায় মৎস্য আইন বাস্তবায়ন, পোনা অবমুক্ত, অভয়াশ্রম স্থাপন ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।’
মৎস্য কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সিএনআরএসের সহযোগিতায় চারান বিলে স্থায়ী অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছিল। মাটি খনন করে গভীরতা বাড়ানো হয়েছিল, যার ফলে বিলটিতে সারা বছর পানি থাকে। নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা, প্রশিক্ষণ ও আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করা হয়।’
কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করছি। কয়েক দিন আগেও চারান বিল থেকে বিপুল চায়না দোয়ারী জাল ধ্বংস করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।’