আজ ২৫ এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। এর মাত্র সপ্তাহখানেক আগে প্রাণঘাতী এ রোগে প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার মৃত্যু দেশে ম্যালেরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে প্রাণঘাতী এ রোগে মৃত্যু ২০২৭ সালের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে ফেলেছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ম্যালেরিয়ায় ১৬ জন মারা গেছেন, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৬ সালে ১৭ জন মারা গিয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৭ সালে ১৩, ২০১৮ সালে ৭, ২০১৯ সালে ৯, ২০২০ সালে ৯, ২০২১ সালে ৯, ২০২২ সালে ১৪ এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ছয়জন করে মারা যান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত বছরগুলোয় দেশে ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। এতে মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। তবে শনাক্ত কমলেও বাড়ছে মৃত্যু। বিশেষ করে পার্বত্য জেলাগুলো যেমন বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারে এখনো ম্যালেরিয়ায় মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শনাক্তের হার কমে আসা ইতিবাচক হলেও মৃত্যুহার বৃদ্ধির বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সময়মতো শনাক্তকরণ, চিকিৎসাপ্রাপ্তি এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যালেরিয়া রোগী পাওয়া যায় জুরাছড়িতে। মোট আক্রান্তের ৩০ শতাংশই জুরাছড়ির। বিলাইছড়ি, বাঘাইছড়ি ও বরকল উপজেলায়ও শনাক্তের হার তুলনামূলক বেশি। কাপ্তাইয়ের ভার্যাতলী (মৌজা) এলাকায় কিছু রোগী শনাক্ত হয়। এছাড়া বাকি উপজেলাগুলোয় রোগী একদম কম। জেলা শহরে নেই বললেই চলে।’
সীমান্ত সড়ক নির্মাণকাজে জড়িত শ্রমিকরা সম্প্রতি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেয়া আছে জ্বর হলেই যেন ম্যালেরিয়া সন্দেহভাজন ধরে জরুরি চিকিৎসা দেয়া হয়। আমরা দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং তাড়াতাড়ি চিকিৎসা প্রদানের নীতি অনুসরণ করছি।’
বান্দরবান সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) জেলায় ম্যালেরিয়া টেস্ট করান মোট ৪১ হাজার ৬১৭ জন। এর মধ্যে ২১৯ জন পজিটিভ শনাক্ত হন। যারা জেলা সদর হাসপাতাল ও সদর উপজেলাসহ সাত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সরকারি চিকিৎসা নিয়েছেন।
বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহীন হোসাইন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়া সৃষ্টিকারী চার প্রজাতির পরজীবী রয়েছে। বাংলাদেশে দুই ধরনের বা প্রজাতির পরজীবী বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী। তবে আগের তুলনায় বর্তমানে ম্যালেরিয়া চিকিৎসা পদ্ধতি অনেক উন্নত হওয়ায় ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগী আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রান্তিক থেকে শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মী, সহযোগী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ফলে ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৫৮। মোট ১৩টি জেলায় রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫ হাজার ২৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে বান্দরবানে। এছাড়া রাঙ্গামাটিতে ৩ হাজার ৬১৪, কক্সবাজারে ৮৪৫ ও খাগড়াছড়িতে ৫৩৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মোট আক্রান্তের প্রায় ৯৯ শতাংশই এ চার জেলার। গত বছর ম্যালেরিয়ায় যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে দুজন এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে একজন করে মারা গেছেন। বাকি একজনের মৃত্যুর তথ্য ঢাকার কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে নথিভুক্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির প্রোগ্রাম অপারেশন উপদেষ্টা ডা. মো. মুশফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর ম্যালেরিয়ায় যে ১৬ জন মারা গেছেন তাদের মধ্যে ছয়জনের ভ্রমণ ইতিহাস পাওয়া যায়নি। ফলে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়েছে। এছাড়া তিনজনের মৃত্যু হয়েছে র্যাপিড ডায়াগনস্টিক চেস্ট (আরডিটি) পরীক্ষার ফলাফল ভুলভাবে নেগেটিভ আসার কারণে। ফলস নেগেটিভ ফলাফলের জন্য সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়নি। একজনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। তিনি বান্দরবানে ভ্রমণ করেছিলেন। সব মিলিয়ে দেরিতে রোগ নির্ণয়, ভ্রমণ ইতিহাসের অনুপস্থিতি এবং আরডিটি পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৃত্যু ঘটেছে। তবে আরডিটি পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এরই মধ্যে মোকাবেলা করা হয়েছে। নতুন ধরনের আরডিটি কিট সংগ্রহ করা হয়েছে, ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।’
দেশে ম্যালেরিয়া সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হলে ওষুধ প্রতিরোধী বা মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে মিয়ানমারে এ ধরনের ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এর প্রবেশ ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সমন্বিত গবেষণা জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সেক্টর প্রোগ্রামের অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত ছিল, যার মধ্যে ম্যালেরিয়া কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গতি কিছুটা কমে গেছে।’