চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশী কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকা কর্মবিরতির কারণে পরিচালন কার্যক্রমে প্রায় অচলাবস্থা চলছে। বন্দরের কর্মচারী ও সেখানে নিয়োজিত বেসরকারি শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেয়ায় গতকাল সকাল ৮টা থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য উঠানো-নামানোর কাজ।
এনসিটি ছাড়াও বন্দরের অন্য দুটি প্রধান টার্মিনাল জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালেও (সিসিটি) কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বন্দরে বিপুলসংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে প্রশাসন। সেই সঙ্গে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই চার কর্মচারীকে ঢাকা পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে (আইসিটি) বদলি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা দেয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার দুই দিনের কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিল বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সব ধরনের পরিচালন কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করা হয়। একইভাবে আজও ৮ ঘণ্টা প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত রাখার কর্মসূচি রয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল সকালে কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর এনসিটিতে কেবল বেসরকারি ডিপো থেকে আনা কিছু রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলা হয়। তবে আমদানি-রফতানি সংক্রান্ত সামগ্রিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে জানান, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি অপারেটররা গতকাল সকাল থেকেই কাজে যোগ দেননি। ফলে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকনও একই কথা জানান। তিনি বলেন, ‘কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মচারী ও শ্রমিকরা অংশ নিচ্ছেন। তাই কর্মবিরতি সফলভাবেই পালিত হচ্ছে।’
এনসিটি ইস্যুতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চার কর্মচারীকে আইসিটিতে বদলি করেছে। তারা হলেন বন্দরের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ), ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন (প্রথম শ্রেণী, নৌ বিভাগ), উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম (অর্থ ও হিসাব বিভাগ) এবং এসএস খালাসি মো. ফরিদুর রহমান (প্রকৌশল বিভাগ)। তাদের আজকের মধ্যেই নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে বদলির আদেশে। এ চার কর্মচারী শ্রমিক দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে চার কর্মচারীকে তাদের বর্তমান বিভাগ থেকে সরিয়ে ঢাকা পানগাঁও আইসিটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে।’
উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দরসংশ্লিষ্ট অন্তত পাঁচ এলাকায় অস্ত্রশস্ত্র বহন ও সব ধরনের মিছিল-সমাবেশের ওপর এক মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নগর পুলিশ। গতকাল রাত ১১টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আজ রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে এটি কার্যকর হবে, যা আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা ও মিছিল-সমাবেশ এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার আমিনুর রশীদ।
বন্দরসংলগ্ন বারেক বিল্ডিং মোড়, নিমতলা মোড়, ৩ নম্বর জেটি গেট, কাস্টমস মোড়, সল্টগোলা ক্রসিংসহ আশপাশ এলাকায় যেকোনো ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও পথসভা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ। সেই সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা, লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য, ইট-পাথর ইত্যাদি বহন ও ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
আমদানি-রফতানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন ও স্বাভাবিক রাখাসহ জনশৃঙ্খলা এবং শান্তি রক্ষার স্বার্থে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ২৯ ও ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সিএমপি কমিশনার। এ বিষয়ে হাসিব আজিজ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, শিল্প-কারখানার কাঁচামালসহ আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার যানবাহন চট্টগ্রাম বন্দরে চলাচল করে। ফলে বন্দরে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন্দর এলাকায় মিছিল, সভা-সমাবেশের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়।’
এদিকে শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে কর্মবিরতি ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখায় সরকারের কত টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের একজন প্রতিনিধিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে কর্মবিরতির কারণে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ, বিশৃঙ্খলা ও কর্মবিরতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাজস্ব কীভাবে আদায় করা সম্ভব সে বিষয়ে সুপারিশ প্রদান। পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এনসিটি পরিচালনা নিয়ে বিরোধ থেকেই এ আন্দোলনের সূত্রপাত। ‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে গতকাল দেয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমানে এনসিটিতে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে চট্টগ্রাম বন্দরের নিট আয় প্রায় ১০৫ ডলার। অথচ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও রেট নেগোসিয়েশন কমিটিকে পাশ কাটিয়ে পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী মাত্র ৪২ ডলারের রেটে ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে টার্মিনালটি হস্তান্তরের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন।
এতে আরো অভিযোগ করা হয়, এ প্রক্রিয়ায় একটি পক্ষ প্রায় ৬০০ কোটি টাকা কমিশন লাভের পাঁয়তারা করছে। একই সঙ্গে এনসিটির ৬০০ স্থায়ী কর্মচারী ও হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট ঘোষণা না দেয়ায় কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এনসিটি ইস্যুতে বিডার প্রধান নির্বাহী আশিক চৌধুরীর অপসারণ এবং চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে তার সব ধরনের তৎপরতা বন্ধের দাবি জানান বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বন্দরের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের সোনার ডিম পাড়া হাঁস চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিলে একটি পক্ষ ৬০০ কোটি টাকা কমিশন পাবে।’
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে পরিচালিত এ প্রকল্পের মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব বন্দরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা করা হয়েছে জাহিদুল ইমামকে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে গতকাল জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের জন্য আগে গঠিত সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি কাজী মেরাজ উদ্দিন আরিফ সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সম্প্রতি তিনি অবসরে যাওয়ায় পদটি শূন্য হয়।